
এক ম্যাচে পদকের উল্লাস, পরের ম্যাচেই নিঃস্ব বাংলাদেশ। চাইনিজ তাইপেকে হারিয়ে যখন পদক নিশ্চিতের আনন্দে পতাকা হাতে উদযাপন করছিল বাংলাদেশ শিবির, তখনও সামনে ছিল জাপানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। সেই ম্যাচে হেরে উল্টো সেমিফাইনালের পথ বন্ধ হয়ে গেল। দুই দশক পর এশিয়ান গেমসে কাবাডিতে পদক ফেরানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা শেষ হলো হতাশায়। আর এই পরিণতির পর প্রশ্ন উঠেছে দলের প্রস্তুতি, ম্যাচ পরিকল্পনা ও পেশাদারত্ব নিয়েও।
পুরুষ কাবাডির ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত, জাপান, চাইনিজ তাইপে ও দক্ষিণ কোরিয়া। ভারত চার ম্যাচ জিতে শীর্ষে থাকলেও বাংলাদেশ, জাপান ও চাইনিজ তাইপে দুটি করে জয় পায়। দক্ষিণ কোরিয়া প্রয়োজনীয় পয়েন্ট অর্জন করতে না পারায় তাদের বিপক্ষে ম্যাচগুলো চূড়ান্ত হিসাবের বাইরে চলে যায়।
ফলে বাংলাদেশ, জাপান ও চাইনিজ তাইপের পারস্পরিক ম্যাচের ফল এবং পয়েন্ট ব্যবধান দিয়ে রানার্সআপ নির্ধারণের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই হিসাবেই বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করে চাইনিজ তাইপে। সেমিফাইনালে উঠে তাদের পদক নিশ্চিত হলেও শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের অভিযান।
সমীকরণে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের হারের ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারত ৪৮-২৫ পয়েন্টে বাংলাদেশকে হারালেও চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে তাদের জয় ছিল ৩৭-২১ ব্যবধানে। ফলে একই প্রতিপক্ষের কাছে বাংলাদেশের বড় ব্যবধানে হার শেষ হিসাবেও প্রভাব ফেলে।
তবে সবচেয়ে বড় আক্ষেপ জাপান ম্যাচ নিয়ে। চাইনিজ তাইপেকে হারানোর পর পদকের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলেও শেষ বাধাটি পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ। জাপানের কাছে হারের পর অন্য ম্যাচের ফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সমীকরণ না মেলায় সেমিফাইনালেই ওঠা হলো না।
কোচ আব্দুল জলিলের ব্যাখ্যাতেও সেই আক্ষেপ স্পষ্ট। তার মতে, জাপানের কাছে হারেই মূলত বাংলাদেশ সমীকরণে পিছিয়ে পড়ে। চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে আরও কিছু পয়েন্টে জয় এবং ভারতের কাছে কম ব্যবধানে হারলে পরিস্থিতি বাংলাদেশের অনুকূলে থাকতে পারত। ভারত যদি চাইনিজ তাইপেকে আরও বড় ব্যবধানে হারাত, তাহলেও বাংলাদেশের সামনে সেমিফাইনালের দরজা খুলে যেতে পারত।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ম্যাচের আগে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টির প্রশ্ন। চাইনিজ তাইপেকে হারানোর পর বাংলাদেশ দলের কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়দের উদযাপনে পদক নিশ্চিত হওয়ার আবহ তৈরি হয়েছিল। পতাকা হাতে ছবি তোলাসহ সেই উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। অথচ তখনও জাপানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি বাকি।
কোচ জলিলও পরে স্বীকার করেছেন, ওই জয়ের বহিঃপ্রকাশ কিছুটা বেশি হয়ে গিয়েছিল। শুধু মানসিক প্রস্তুতিই নয়, পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের রক্ষণভাগও প্রত্যাশিত মানে ছিল না। জাপানের বিপক্ষে ডিফেন্সের দুর্বলতাই শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পেছনে তাকালে প্রস্তুতির ঘাটতির প্রশ্নটিও সামনে আসে। কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইসরাইল হাওলাদার জানিয়েছেন, কয়েকজন খেলোয়াড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা থাকলেও তা করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, প্রতিপক্ষ দলগুলো বাংলাদেশের চেয়ে বেশি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক কোচিং ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
অথচ প্রস্তুতিতে অর্থের অভাব ছিল না। এশিয়ান গেমস সামনে রেখে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে অনুশীলন করেছে দল। আগের কমিটির সময়ে বিদেশে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনাও ছিল। পরে কমিটি পরিবর্তনের পর সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
এশিয়ান গেমসে কাবাডি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পদকের উৎস। এবারও সেই ধারায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পদক নিশ্চিতের আগেই উদযাপন, এরপর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হার এবং শেষ পর্যন্ত হিসাবের মারপ্যাঁচে বিদায়- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কাবাডি অভিযানের শেষটা হয়েছে বড় হতাশায়।