বাহুবল মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

সারাদেশ

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ ১৫ দিন ধরে

2026-09-22T15:00:42+00:00
2026-09-22T15:00:42+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
বাহুবল মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকার প্রকল্পে ধীরগতি, নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০০ পিএম 
ছবিঃ ভোরের ডাক

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ ১৫ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি প্রকল্পের কাজ মাঝপথে থেমে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ। শুধু কাজ বন্ধ থাকাই নয়, নির্মাণকাজের গুণগত মান, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী, প্রকৌশলগত তদারকি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকেই প্রকল্পের নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্মাণে নিম্নমানের বালু, ইট ও ব্লকসহ বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন তারা। এমনকি ছাদ নির্মাণসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজে নির্ধারিত নিয়ম ও প্রকৌশলগত মান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা ও স্পেসিফিকেশন, কার্যাদেশের শর্ত, ব্যবহৃত সামগ্রীর পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তদারকি-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে বাহুবল মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। প্রকল্প এলাকায় নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য উপকরণ পড়ে রয়েছে। দুই-তিনজন শ্রমিককে এলাকায় দেখা গেলেও মূল নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ ছিল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহ ধরে কাজের গতি একেবারেই কমে গেছে। গত প্রায় ১৫ দিন ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা ছিল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মডেল মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হয়ে সেখানে নামাজসহ ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই প্রত্যাশা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

প্রকল্প এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়েই তাদের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন। তাদের অভিযোগ, ব্যবহৃত বালু ও ইট-ব্লকের মান সব সময় সন্তোষজনক নয়। ছাদ নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই। প্রতিটি ধাপে প্রকৌশলীদের উপস্থিতি, উপকরণের মান পরীক্ষা এবং কাজের পরিমাপ যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।

তাদের আশঙ্কা, নির্মাণকাজের সময় মান নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে না করা হলে ভবিষ্যতে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

তবে এসব অভিযোগ নিশ্চিত করতে কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষ করে বালু, ব্লক, কংক্রিট ও রডসহ ব্যবহৃত সামগ্রীর নমুনা পরীক্ষা করে প্রকল্পের অনুমোদিত স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি স্পষ্ট হতে পারে।

নির্মাণকাজের মান ও বালু ব্যবহারের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. হিমায়েত হোসেন বলেন, তারা দুজন যৌথভাবে প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করছেন। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজে গুণগত মান বজায় রেখেই কাজ করা হচ্ছে।

বালুর মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকেই বালু নেওয়া হচ্ছে এবং মান ঠিক রেখেই তা ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে বালু না নিলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকরা ছুটিতে ছিলেন। কয়েকজন শ্রমিক ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছেন এবং অন্য শ্রমিকরাও ফিরে এলে পুনরায় পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হবে।

ঠিকাদারের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ বন্ধ থাকার কারণ শ্রমিকদের ছুটি। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রায় ১৫ দিন ধরে একটি বড় সরকারি প্রকল্পের নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ থাকার বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না এবং এ সময়ে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।

এ ছাড়া কাজ বন্ধ থাকার সময়ে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করেছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহলের সদস্যরা।

হবিগঞ্জ জেলার অন্যান্য উপজেলায় নির্মাণাধীন মডেল মসজিদ প্রকল্পগুলোর অনেকগুলোর কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কোথাও কোথাও মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ আদায় করছেন। অথচ বাহুবল উপজেলার মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।

একই জেলার অন্যান্য প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করলে বাহুবল প্রকল্পের অগ্রগতি কেন পিছিয়ে রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু কাজ শেষ করলেই হবে না; সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবনটি যেন দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও টেকসই হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কাজ বন্ধ থাকার বিষয়ে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ছুটির কথা বলা হলেও স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। প্রকল্পের কাজ বন্ধের পেছনে শ্রমিক সংকটই একমাত্র কারণ কি না, নাকি বিল পরিশোধ, নির্মাণসামগ্রী, কারিগরি সমস্যা, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে একটি সরকারি প্রকল্পের নির্মাণকাজ টানা ১৫ দিন বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

নির্মাণকাজ বন্ধ থাকা, প্রকল্পের অগ্রগতি, নির্মাণসামগ্রীর মান ও প্রকৌশলগত তদারকির বিষয়ে হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাবিব উল্লাহর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্মাণকাজের সার্বিক মান যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

তাদের দাবি, প্রকল্পের নকশা ও কার্যাদেশ অনুযায়ী নির্মাণকাজ হচ্ছে কি না, ব্যবহৃত বালু, ইট-ব্লক, রড ও কংক্রিটের মান নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রয়েছে কি না এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত কাজগুলো প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে কারিগরি তদন্ত করা হোক।

একই সঙ্গে প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয়, পরিশোধিত বিল, কাজের নির্ধারিত সময়সীমা এবং বর্তমানে কাজ বন্ধ থাকার কারণ জনসম্মুখে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সরকারি অর্থে নির্মিত একটি মডেল মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এর সঙ্গে জনগণের অর্থ, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহার জড়িত। তাই নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে পুনরায় পুরোদমে কাজ শুরুর কথা বলা হলেও বাস্তবে কাজ কবে থেকে পূর্ণগতিতে শুরু হয় এবং স্থানীয়দের উত্থাপিত নির্মাণমান ও তদারকির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর স্থানীয়দের।



Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: