জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা দ্রুত শেষ করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদে রিপোর্ট দিতে চায় বিশেষ সংসদীয় কমিটি। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫টি দলের প্রতিনিধি সরাসরি অংশ নেন। একটি দল লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছে এবং আরেকটি দলের প্রতিনিধি অসুস্থতাজনিত কারণে উপস্থিত হতে পারেননি। সব মিলিয়ে ১৭টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের কথা জানান তিনি।
কমিটির সভাপতি বলেন, আন্দোলনে যুক্ত সংগঠনের প্রতিনিধি, শহীদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বক্তব্যও নেওয়া হবে। জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রস্তাব এলে সেগুলোও পরামর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। সম্ভব হলে প্রতি সপ্তাহে কমিটির বৈঠক করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঐকমত্যের বিষয় বাস্তবায়নের কথা
জুলাই জাতীয় সনদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এর কিছু বিষয় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে, আবার কিছু আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়েও আলোচনা
নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো দল কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে সেটি নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরেন তিনি। ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠিত হবে—সংসদে আসনের অনুপাতে নাকি ভোটের আনুপাতিক হারে—তা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিএনপিকে নিয়ে ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপিকে ঘিরে মাঠে ‘বিভ্রান্তিকর প্রচারণা’ চলছে বলে অভিযোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তার দাবি, বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না—এমন প্রচারণা ‘সম্পূর্ণ অসত্য’।
তিনি বলেন, স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ীই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হবে এবং আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
বিরোধী দল না এলেও আলোচনার সুযোগ
বিশেষ কমিটির বৈঠকে কোনো রাজনৈতিক দল অংশ না নিলেও প্রক্রিয়াটি একপক্ষীয় হবে না বলে মন্তব্য করেন কমিটির সভাপতি। তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর না করা রাজনৈতিক দলগুলোকেও মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দল চাইলে লিখিত প্রস্তাব দিতে পারবে এবং তা কমিটি বিবেচনা করবে।
ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষের লক্ষ্য
কমিটির কাজের সময়সীমা সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগোচ্ছেন। এরই মধ্যে রিপোর্ট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবিধান পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন দেশে সময়ের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে কোনো সরকার সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে জনচাহিদা ও সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনায় সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে।
উচ্চকক্ষ নিয়ে বিএনপির প্রস্তাব
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব বিএনপির সংস্কার প্রস্তাব ও নির্বাচনি ইশতেহারে রয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। জুলাই জাতীয় সনদেও বিষয়টি প্রস্তাব হিসেবে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, উচ্চকক্ষ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে সেটি গঠনের পথ তৈরি হবে। তবে ভবিষ্যতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এর কাঠামোতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনের পার্থক্য প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যেসব পরিবর্তন আনা হবে, সেগুলো সংশোধনী হিসেবেই বিবেচিত হবে। আর কিছু সংস্কার আইন, বিধি-বিধান বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেও করা সম্ভব। বর্তমান সংবিধান বহাল রেখেই এসব পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া এগোবে বলে জানান তিনি।