সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের ঘটনায় নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কুমিল্লায় ছবি তুলতে বেরিয়ে নিখোঁজ ১৩ বছরের স্কুলছাত্রের মরদেহ উদ্ধার, খুলনায় ‘ভাত চুরির’ অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা, সাভারে পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হত্যাসহ একের পর এক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শুধু অপরাধপ্রবণ এলাকাই নয়, ব্যস্ত সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও আবাসিক এলাকাতেও ঘটছে প্রাণঘাতী অপরাধ। এ পরিস্থিতিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা, নজরদারি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীদের কেউ কেউ।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লায় মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় ১৩ বছরের স্কুলছাত্র অপ্রতিম। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।
একই রাতে খুলনা নগরের একটি ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরির’ অভিযোগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে।
এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে রাজধানীর শনির আখড়ায় ব্যবসায়ী আসমান খানকে তার প্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
৪ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় মো. ইসমাইল নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ পরে জানায়, ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার তার কাছে থাকা টাকার তথ্য জানতে তাকে বাসের ভেতরে হাত-মুখ বেঁধে ও গলায় টাওয়েল পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে মরদেহটি এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে রাখা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বিভিন্ন এলাকায়। গত ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর টানাহেঁচড়ায় অটোরিকশা থেকে পড়ে মারা যান বগুড়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন।
এর আগে ৯ আগস্ট ঢাকার উত্তরায় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ১ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পুরো টাকা উদ্ধার হয়নি। পরে একই এলাকায় অস্ত্রের মুখে আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২ লাখ ১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ৩১ আগস্ট ধানমন্ডিতে ব্যাংক থেকে ৩৯ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার সময় মোটরসাইকেলে এসে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়।
এ ছাড়া গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২২ আগস্ট রংপুরে একটি তালাবদ্ধ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যা বলছেন আইনজীবীরা
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি হয়নি বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষ্য, পুলিশের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার ধারণা তৈরি হলে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাও অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, শিক্ষার ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের অভাব অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। তার মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ফৌজদারি অপরাধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান পুলিশের সংস্কার এবং সদস্যদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাত থেকে মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
তার ভাষ্য, পুলিশ নিষ্ক্রিয় বা আক্রান্ত হলে সাধারণ মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অপরাধের বিচার না হলে নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলকভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে, তা কমাতে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা, কার্যকর তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন আইন অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা।