চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ঐতিহাসিক ডলু নদী থেকে ‘স্বেচ্ছায় খনন’ কর্মসূচির আওতায় মাটি ও বালি উত্তোলনের জন্য দেওয়া বিতর্কিত অনুমোদন বাতিল করেছে উপজেলা প্রশাসন। গত ২৭ আগস্ট অনুমোদন দেওয়ার পর একই দিনে পৃথক স্মারকের মাধ্যমে সেটি বাতিল করা হয়।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের নথি থেকে বিষয়টি জানা গেছে। সদ্যবিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান অনুমোদন ও পরবর্তী বাতিলের চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।
উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া আগের অনুমোদন অনুযায়ী, ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ডলু নদীর সাতকানিয়া অংশে চর জেগে ওঠা মাটি ও বালি অপসারণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, গারাঙ্গিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকে নলুয়া-আমিলাইষ তিন খালের মুখ পর্যন্ত নদীর অংশ থেকে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট মাটি ও বালি অপসারণের কথা ছিল।
তবে অনুমোদন দেওয়ার পরই খননকাজের কারিগরি প্রক্রিয়া, উত্তোলনযোগ্য মাটি-বালির পরিমাণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আগের অনুমোদনপত্রে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) খননকাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। তবে পাউবো কর্মকর্তারা জানান, নদী খননের নির্দিষ্ট কারিগরি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের ওই অনুমোদনের আওতায় তাদের তদারকির সুযোগ ছিল না।
এদিকে অনুমোদন বাতিলের আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আবদুল করিম দাবি করেছিলেন, তারা অনুমোদন বাতিলের কোনো চিঠি পাননি। আবহাওয়া অনুকূলে এলে কাজ শুরু করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে উপজেলা প্রশাসনের নথিতে অনুমোদন বাতিলের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সিদ্ধান্তটি কবে এবং কীভাবে জানানো হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে বাতিলের চিঠিতে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করে শুধু ‘অনিবার্য কারণবশত’ বলা হয়েছে।
অনুমোদন বাতিলের বিষয়ে সদ্যবিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, “ডলু খাল একটি সংবেদনশীল ইস্যু। অনুমোদন দেওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন সংস্থার সঙ্গে বিশদ আলোচনা করা উচিত ছিল, যা সময়ের স্বল্পতার কারণে আমি করতে পারিনি। বর্তমান ইউএনও হয়তো সবার সঙ্গে বসে বিষয়টি চূড়ান্ত করবেন।”
ডলু নদীকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল প্রাকৃতিক প্রবাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার।
তিনি বলেন, নদীর নাব্যতা রক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া উদ্যোগকে পাউবো ইতিবাচকভাবে দেখে। তবে নদী খনন বা বালি উত্তোলনের মতো কারিগরি কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) এবং যথাযথ নকশা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসনের আগের অনুমোদনে পাউবোর তদারকির কথা বলা হলেও এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর এখতিয়ার ও কারিগরি বিধিমালা যাচাই করা জরুরি। ডলু নদীর মতো সংবেদনশীল নদীতে ভবিষ্যতে যেকোনো খনন বা উন্নয়নকাজের আগে বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা, নদীর সঠিক পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যৌথ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ডলু নদীকে ঘিরে একসময় নৌযোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছিল। স্থানীয়দের মতে, নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও দখল-দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
তবে অপরিকল্পিতভাবে মাটি-বালি উত্তোলনের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট কারিগরি সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব যাচাই, নদীর প্রকৃত সীমানা ও নকশা নির্ধারণ এবং সরকারি রাজস্বের বিষয়টি স্বচ্ছ রেখে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন ডলু নদী নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়, সেদিকেই নজর স্থানীয়দের। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ যেন কোনোভাবেই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি না করে—এ বিষয়টি নিশ্চিত করেই ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নেওয়া প্রয়োজন।