বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন ডলারের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমাতে নতুন পথ খুঁজছে বিভিন্ন দেশ, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের দীর্ঘদিনের প্রভাব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় দুই বছর অতিক্রম করার পর বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বিকল্প তৈরির প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে।
বিশ্লেষণে এ প্রবণতার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ, বৈদেশিক নীতিতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ব্যাপক প্রয়োগ এবং মার্কিন নীতির ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা।
আইএমএফের চীন বিভাগের সাবেক প্রধান এসওয়ার প্রসাদের মতে, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞাকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কারণে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারি বিনিয়োগকারী তাদের সম্পদে বৈচিত্র্য আনার কথা ভাবছে।
তবে এসব পরিবর্তনের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির শেয়ারবাজার ও আর্থিক খাতে বিদেশি বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো ঘিরে বিনিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি এখনো এমন কোনো মুদ্রা নেই, যা বৈশ্বিক পরিসরে ডলারের সমপর্যায়ের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মঙ্গলবার কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অবস্থানের পক্ষে কথা বলেন। তাঁর দাবি, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের নিলাম ভালোভাবেই সম্পন্ন হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের প্রভাবও শক্তিশালী রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারে ঋণ নিয়ে উদ্বেগের কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত ঝুঁকির বিপরীতে বেশি মুনাফা দাবি করায় চলতি সপ্তাহে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ২০০৭ সালের পর এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও মার্কিন সম্পদ নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ চলছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার্বভৌম সম্পদ তহবিল নরওয়ের ওয়েলথ ফান্ড চলতি মাসে জানিয়েছে, তারা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ কমিয়ে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ খুঁজবে।
বিশ্ব বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে ডলারের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ডলারে হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ ধীরে ধীরে কমেছে। ২০১৫ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভের প্রায় ৬৪ শতাংশ ডলারে থাকলেও ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা প্রায় ৫৬ শতাংশে নেমে আসে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ডলারভিত্তিক আর্থিক অবকাঠামোকে বৈদেশিক নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তার উদাহরণ। তবে নিষেধাজ্ঞার বিস্তৃত প্রয়োগের ফলে কিছু দেশ নিজেদের জন্য বিকল্প লেনদেন ও অর্থায়ন ব্যবস্থা তৈরিতে আরও সক্রিয় হয়েছে।
প্রযুক্তিও এই পরিবর্তনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। চীন হংকং, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে ‘এমব্রিজ’ নামে একটি আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত ও কম ব্যয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা।
রাশিয়া ও ভারতও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। এমন ব্যবস্থা কার্যকর হলে পশ্চিমা আর্থিক অবকাঠামোর ওপর তাদের নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শুধু ডিজিটাল মুদ্রা নয়, স্বর্ণও আবার অনেক দেশের রিজার্ভ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক রিজার্ভে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা স্বর্ণের মূল্যমান প্রথমবারের মতো বিদেশি সরকারি সংস্থাগুলোর মালিকানাধীন মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের মূল্যকে ছাড়িয়ে যায়। একই বছরে স্বর্ণের দামও প্রথমবারের মতো প্রতি ট্রয় আউন্স ৫ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষিত স্বর্ণের একটি অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নেদারল্যান্ডস উত্তর আমেরিকায় রাখা ৯৫ টন স্বর্ণের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফ্রান্সও চলতি বছরের মার্চে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে ১২৯ টন স্বর্ণ প্যারিসে স্থানান্তর করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও আর্থিক শক্তি। তবে ঋণের পরিমাণ, নিষেধাজ্ঞা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলো অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ভবিষ্যতের আর্থিক নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে ভাবার কারণ হয়ে উঠছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং অলিভার ওয়াইম্যানের অংশীদার ড্যানিয়েল ট্যানেনবাউমের ভাষায়, সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন পরিস্থিতির কথাও বিবেচনা করছে—কখনো যদি যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক প্রভাব কোনো দেশের বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, তখন তার সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে।