তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেই বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। এমন পরিস্থিতিতে বড় দুই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র— পটুয়াখালীর আরএনপিএল ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী— পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়জনিত ঘাটতির বিপরীতে সরকারের কাছে ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা চাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এই অর্থ দ্রুত ছাড় না হলে কেন্দ্র দুটির জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তাই লোডশেডিং কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে এই টাকা চাওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখা থেকে গত ৯ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে জাতীয় স্বার্থে পিডিবিকে এই অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, আরএনপিএল ও মাতারবাড়ী কেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করা হলে কেন্দ্র দুটির উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা, প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদ নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ লোডশেডিং সামাল দিতে চাওয়া এই অর্থের বড় একটি অংশ সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার সঙ্গে যুক্ত।
আদানির বিদ্যুৎ নিয়েও চাপ : লোডশেডিংয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে ভারত ও নেপালসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ কিনছে পিডিবি। এর মধ্যে আদানি পাওয়ার ঝাড়খন্ড থেকেও বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বৃহৎ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করায় পিডিবির আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল এবং আমদানি করা বিদ্যুতের দাম পরিশোধের চাপও রয়েছে। ফলে একদিকে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে পিডিবির আর্থিক ঘাটতি— দুই দিকের চাপই বাড়ছে। এর মধ্যেই আরএনপিএল ও মাতারবাড়ী কেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ না হওয়ায় নতুন করে অর্থসংকট তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্র দুটি পূর্ণ সক্ষমতায় না চললে চাপ বাড়বে : পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫। দুই ইউনিট একসঙ্গে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় ২৮ মে ২০২৬। চুক্তি অনুযায়ী পিডিবি কেন্দ্রটির সক্ষমতা ও উৎপাদনের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করছে। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের প্রাপ্য বকেয়া ভর্তুকি এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০২৪। কেন্দ্রটির সক্ষমতা ও উৎপাদনের বিপরীতে পিডিবি অর্থ পরিশোধ করলেও ওই সময় থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়জনিত ঘাটতির বিপরীতে প্রাপ্য ভর্তুকি বকেয়া রয়েছে। দুই কেন্দ্রের এই বকেয়া মিলিয়েই ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ বিভাগের আশঙ্কা, বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধে দেরি হলে কেন্দ্র পরিচালনার প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আরএনপিএলের ক্ষেত্রে কয়লার মজুদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়টিও রয়েছে।
আরএনপিএলের সামনে ১,৬৮৮ কোটি টাকার কিস্তি : আরএনপিএল কেন্দ্র নির্মাণে নেওয়া বিদেশি ঋণের ৫০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম নিশ্চয়তা দিয়েছে। গত ২৫ মার্চ প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ বাবদ ১৩৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৭২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে আরও ১৩৬ দশমিক ১৩১৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সরকারের দেওয়া সার্বভৌম নিশ্চয়তার আওতায় ঋণখেলাপির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে আরএনপিএল।
আরএনপিএলের মাসিক বিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে সময়মতো ভর্তুকি পাওয়া গেলে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদও রাখা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আর কয়লার জোগান নিশ্চিত থাকলে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
টাকা চেয়ে চিঠি, জবাব নেই সরকারের : এই পরিস্থিতিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ছাড়ের অনুরোধ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন বজায় রাখা জরুরি। তাই বকেয়া ভর্তুকির অর্থ দ্রুত পিডিবিকে দেওয়ার প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সোলায়মান ভোরের ডাককে বলেন, দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি বাবদ অর্থ বিভাগের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। এখনো অর্থ বিভাগ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এই টাকা পাওয়া গেলে আরএনপিএল ও মাতারবাড়ী— দুই কেন্দ্রই পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিং কমবে।
অর্থাৎ, বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে এখন ৪ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা শুধু বকেয়া পরিশোধের অর্থ নয়; সংকটের সময়ে দুই বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার অর্থও। অর্থ ছাড় হলে কয়লা আমদানি ও মজুদ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং কেন্দ্র দুটির নিয়মিত উৎপাদন— সবকিছুই স্বাভাবিক রাখা সহজ হবে। আর কেন্দ্র দুটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিংয়ের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।