জাতীয় নির্বাচনের পর আবারও ভোটের মাঠে ফিরছে দেশের রাজনীতি। এবার সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হচ্ছে সেই ভোটপর্ব। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সারাদেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সাত ধাপে করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল সোমবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের মাধ্যমে শুরু হবে স্থানীয় সরকারের বড় এই উৎসব। মোট ৭টি ধাপে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে ৭টি ধাপে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষিত প্রাথমিক তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ হবে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট নেওয়া হবে ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপের ভোট অনুষ্ঠিত হবে ৩০ ডিসেম্বর। পরবর্তী ধাপগুলোর সময়সূচি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি চতুর্থ ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম ধাপ, ২২ এপ্রিল ষষ্ঠ ধাপ এবং সর্বশেষ ২৭ মে সপ্তম ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
একই সময়ে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ঘিরেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। রোববার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে।গতকাল সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। সরকারী দল বিএনপি এখনো ঢাকার দুই সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেনি, তবে দলটির সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র থেকে এখন স্থানীয় ভোটের মাঠে মনোযোগ সরছে। প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক শক্তি যাচাই এবং মাঠের নিয়ন্ত্রণ—তিন দলই স্থানীয় নির্বাচনকে নিজেদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে।
১২ নভেম্বর ইউপি ভোট দিয়ে শুরু: গতকাল নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর। দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হতে পারে। ইসির পরিকল্পনায় প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলেও স্থানীয় সরকারের পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন। অর্থাৎ আগামী কয়েক মাসে দেশের রাজনীতির বড় অংশই স্থানীয় ভোটকে ঘিরে আবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও আগেই বলেছেন, এবারের স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় হবে এবং কে নির্বাচনে অংশ নেবে বা নেবে না, সেটি নির্বাচন কমিশন ও আদালতের বিষয়।
ঢাকার দুই সিটে মুখোমুখি জামায়াত-এনসিপি : ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিনেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ স্পষ্ট হলো। রোববার, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেছেন, সিটি করপোরেশনসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই তাঁরা এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গতকাল ঢাকার দুই সিটিতে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করল জামায়াতে ইসলামী। ঢাকা উত্তরে দলটির প্রার্থী মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। দক্ষিণে প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি আবু সাদিক কায়েম।
অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক জামায়াত ও এনসিপি এবার স্থানীয় ভোটে আলাদা মাঠে নামছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে শরিকদের মধ্যে কোনো সমঝোতা হবে না, দলগুলো নিজেদের মতো প্রস্তুতি নেবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা হলে কেন্দ্র থেকে বাধা থাকবে না।
সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু বিএনপির : ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপি প্রার্থী ঘোষণা করলেও বিএনপি এখনো কোনো প্রার্থী দেয়নি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থী সমর্থন এবং নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরদারি থাকবে। একই সঙ্গে একেক এলাকায় একাধিক প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাতে দলীয় ভোট বিভক্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে দলটি। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপি সূত্র ভোরের ডাককে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়ানো এবং শূন্য পদ পূরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার শুরু: জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর রাজনীতির মূল প্রতিযোগিতা এতদিন সংসদ, সরকার পরিচালনা ও জাতীয় ইস্যুকে ঘিরে ছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল সেই রাজনীতিকে এবার সরাসরি মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এর প্রথম দৃশ্যপট ইউনিয়ন পরিষদ। আর রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে সবচেয়ে বড় লড়াইগুলোর একটি হতে পারে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। দুই সিটিতে জামায়াত ও এনসিপি আগেভাগেই প্রার্থী দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। বিএনপি এখনো নাম ঘোষণা না করলেও দলটির তৃণমূল প্রস্তুতি এবং কেন্দ্রীয় নজরদারির সিদ্ধান্ত বলছে, তারাও মাঠ ছাড়ছে না। ফলে স্থানীয় নির্বাচন আর কেবল প্রশাসনিক নির্বাচন থাকছে না, এটি হয়ে উঠছে জাতীয় নির্বাচনের পর দলগুলোর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সক্ষমতা যাচাইয়ের নতুন মঞ্চ।