গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পেয়ে শিক্ষার্থীদের মনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগিয়েছিলেন ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে এই কমিটির মেয়াদ। ভোটের পূর্বে প্রথম বর্ষেই বৈধ সিট, উন্নত খাবার আর নিরাপদ ক্যাম্পাস বিনির্মাণসহ নানা চমকপ্রদ স্বপ্ন আঁকা হয়েছিল হলের দেয়ালে দেয়ালে। কিন্তু ক্ষমতার এক বছর পেরিয়ে হিসাব মেলাতে বসে চরম হতাশা আর ক্ষোভ ঝরছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। প্রতিশ্রুতির চটকদার বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে ব্যর্থতা। কেবল মৌলিক দাবিগুলোই অপূরণীয় থাকেনি; বরং লেজুরভিত্তিক রাজনীতির চর্চা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে ম্লান হয়ে পড়েছে ডাকসুর নেতৃত্ব।
ডাকসু ভোটের পূর্বে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ১২ মাসে ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই ইশতেহারে সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার ছিল, প্রথম বর্ষ থেকেই হলের প্রতিটি শিক্ষার্থী পাবেন বৈধ আসন। অথচ এক বছর মেয়াদপূর্তির পরও বাস্তবচিত্র হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী এখনো সিটবঞ্চিত। এর মধ্যে মোট ছাত্রীর ৬৫ শতাংশ ও মোট ছাত্রের ৪২ শতাংশ এখনো থাকছেন হলের বাইরে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে অমর একুশে হলে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী শাফিনূর রহমান তাজিম আক্ষেপ করে জানান, ক্লাস শুরুর পাঁচ মাস পরও হলে জায়গা মেলেনি। একই শিক্ষাবর্ষে জহুরুল হক হলে ভর্তি হওয়া আরেক শিক্ষার্থী রাহাত হোসেন ভোরের ডাককে বলেন, অন্যত্র চান্স পেয়েও ঢাবিতে ভর্তি হয়েছি। এখন বাইরে চড়া দামে ভাড়া থেকে নিত্যদিনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নারী হলগুলোতেও আবাসনসংকট এখনো অত্যন্ত তীব্র। কুয়েত মৈত্রী হলে ভর্তি হওয়া তাজনীন স্বর্ণা ভোরের ডাককে বলেন, গ্রাম থেকে এসে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছি, প্রথমে কিছুদিন আত্মীয়ের বাসায় থাকলেও এখন মেসে থাকছি। প্রতিনিয়ত নানান প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ভোগান্তির গল্প সেখানেই শেষ নয়। ইশতেহারে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও মিল ভাউচারের কথা বলা হলেও বাস্তবচিত্র আরও করুণ। সম্প্রতি একাধিক হলের ক্যান্টিনের খাবারে কেঁচো, ব্লেড ও তেলাপোকা পাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। এসবের পর ডাকসু নেতাদের কোনো প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েনি।
নিরপেক্ষ মুখোশে লেজুরবৃত্তির রাজনীতি: নির্বাচনের আগে নিজেদের ‘দলীয় লেজুরবৃত্তিমুক্ত’ ও নিরপেক্ষ বলে প্রচার করেছিলেন বিজয়ী প্যানেলের নেতারা। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পেতেই সেই নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে পড়ে বলে অভিযোগ প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনগুলোর। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও এজিএস মুহা. মহিউদ্দীন খান সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। এমনকি ঢাকা দক্ষিণ সিটির আগামীর নির্বাচনে সাদিক কায়েমকে নিজেদের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে জামায়াত। এসবের কারণে দলীয় লেজুরবৃত্তির অভিযোগ করেছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। ছাত্রদলের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, নির্দলীয় মুখোশ পড়ে বিজয়ী হয়ে ডাকসু নেতারা মূলত নির্দিষ্ট দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন।
ক্ষমতার দাপট ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড: গত এক বছরে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের চেয়ে বিতর্ক সৃষ্টিতেই যেন বেশি এগিয়ে ছিলেন ডাকসু নেতারা। ক্যাম্পাস উচ্ছেদের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিনা নোটিশে দোকান সরানো, হকার পেটানো, ফুটপাতে প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে শাসানো, মাঠে খেলতে যাওয়া ছোট শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানো, শিক্ষককে হেনস্তা করে ক্যাম্পাস ছাড়াকরণ, আইন হাতে তুলে মবে নেতৃত্ব দেওয়া, সনাতন শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করে জেলে পাঠানো, কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, হিজড়াদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধে মাত্র তিন প্রতিনিধির উপস্থিতি নিয়ে প্রবল তোপের মুখে পড়েন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে ভয়ের সংস্কৃতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়েছিল, ভোটে জেতার পর বলপ্রয়োগের ধারায় সেই পুরোনো রাজনীতির ভয়ের সংস্কৃতিই ফিরে এসেছে।
বিতর্কের মুখে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ অবশ্য দাবি করছেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়া ৩৬টি ইশতেহারের সূচনা তাঁরা করেছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অসহযোগিতার কারণে কাজগুলো শেষ করা যায়নি। প্রশাসনের বরাদ্দ মাত্র ৩৫ লাখ টাকা হলেও তাঁরা বিভিন্ন স্পনসর থেকে ৩০ কোটি টাকার কাজ করিয়েছেন এবং আবাসন সমস্যা দূরীকরণের জন্য ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প এনেছেন বলেও তারা দাবি করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই অভিযোগ নাকচ করেছে। কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ডাকসুর বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়েও বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সাদিক কায়েম আরও জানান, তাদের নেতৃত্বে ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনলাইন পেমেন্ট চালুকরণ, কমনরুম সংস্কার, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নতুন রিসোর্স যুক্তকরণ, মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, স্কিল ডেভেলপমেন্ট সামিট আয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়ন, বাসের ট্রিপ বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ওদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন উল্টো কথা। হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী নিয়ামুল ইসলাম বলেছেন, নির্বাচনের পরপর তদারকির নামে কিছুটা নাটকীয়তা হলেও খাবারের মানে স্থায়ী কোনো বদল আসেনি। অন্যদিকে, শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী প্রিয়ন্তী ও ইসরাত জাহান জানান, বহিরাগত ও মাদকসেবীদের অবাধ বিচরণে রাতের ক্যাম্পাস ছাত্রী হেনস্থার ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারেনি। আতঙ্কের কারণে ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস’ কথাটি কেবল কাগজেই রয়ে গেছে। স্যার এ এফ রহমান হলের ইশতিয়াক আহমেদ ভোরের ডাককে বলেন, ডাকসুর বর্তমান কমিটি ছোট কোনো কাজ করলেও এটাকে বিশদভাবে প্রচার করান। যদিও কিছু কিছু সংস্কারে তারা হাত দিয়েছেন, তবে সেটা এক মাস/দুই মাসের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থে তারা টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজ করতে পারেননি।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান কমিটি দায়িত্ব ও শপথ গ্রহণ করেন।গত ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হলো তাদের দায়িত্বপালনের মেয়াদ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই সংসদ। উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম নতুন নির্বাচনের কথা বললেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, আবার যেন আটকে না যায় নতুন নির্বাচন।