ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অসংখ্য চরিত্র এসেছে, হারিয়েও গেছে। কিন্তু একটি চরিত্র আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন—নবাব সিরাজউদ্দৌলা। আর এই চরিত্রকে পর্দায় এমনভাবে জীবন্ত করেছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, যে নবাবের নামের সঙ্গেই জড়িয়ে যায় তার নাম।
আজ কিংবদন্তি এই অভিনেতার প্রয়াণের এক যুগ। ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৮২ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু তার অভিনীত চরিত্রগুলো এখনো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমা তাকে এনে দেয় অনন্য পরিচিতি—ঢাকাই চলচ্চিত্রের ‘নবাব’।
তবে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ দিয়ে আনোয়ার হোসেনের অভিনয়যাত্রা শুরু হয়নি। এর বহু আগেই মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি।
১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুরের মুরুলিয়া গ্রামের মিয়াবাড়িতে জন্ম আনোয়ার হোসেনের। বাবা এ কে এম নাজির হোসেন ছিলেন জেলা সাব-রেজিস্ট্রার। শৈশব থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
ময়মনসিংহ কলেজে পড়ার সময় আসকার ইবনে শাইখের ‘পদক্ষেপ’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে মঞ্চে তার যাত্রা শুরু হয়। পরে ঢাকায় এসে চাকরির পাশাপাশি নাট্যচর্চা চালিয়ে যান। ১৯৫৯ সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ননী দাসের পরিচালনায় ‘এক টুকরো জমি’ নাটকে অভিনয় করেন। ঢাকা বেতারেও অভিনয় করেছেন তিনি।
পরবর্তীতে নাট্যদল মিনার্ভা থিয়েটার গড়ে তোলেন আনোয়ার হোসেন। এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দেশের আরও অনেক গুণী শিল্পী।
১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ সিনেমায় ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় আনোয়ার হোসেনের। এরপর সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ সিনেমায় নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন।
১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮টি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। কিন্তু ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ১৯৬৭ সালে।
১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সিনেমা ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’। নাম ভূমিকায় আনোয়ার হোসেনের অভিনয় দর্শককে যেন অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা, বেদনা ও করুণ পরিণতি তিনি পর্দায় এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেন যে চরিত্রটি হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় অভিনয়।
সেই সিনেমার পর থেকেই দর্শকের কাছে আনোয়ার হোসেন হয়ে ওঠেন ‘নবাব’। চরিত্রটি আর শুধু একটি সিনেমার চরিত্র থাকেনি; তা মিশে যায় তার অভিনয়-পরিচয়ের সঙ্গে।
‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সাহিত্যনির্ভর, সামাজিক, পারিবারিক, লোককাহিনি ও ফ্যান্টাসিনির্ভর নানা সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।
‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘জয় বাংলা’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘পালঙ্ক’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘নাজমা’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘সূর্যসংগ্রাম’, ‘দায়ী কে’ ও ‘সত্য মিথ্যার’ মতো বহু সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
দেশের খ্যাতিমান প্রায় সব পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে অভিনয় করেছেন প্রায় সাড়ে তিনশ সিনেমায়।
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। নিগার পুরস্কার, দুবার বাচসাস পুরস্কারসহ ১৯৮৫ সালে অর্জন করেন একুশে পদক।
২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।
২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের ইতি টেনে একই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান এই কিংবদন্তি।
আনোয়ার হোসেন নেই—কিন্তু তার অভিনয় এখনো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় তার অভিনয় তাকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে একজন অভিনেতা আর একটি চরিত্র যেন একই পরিচয়ে মিশে যায়।
তাই পর্দায় যতদিন সিরাজউদ্দৌলার গল্প বলা হবে, ততদিন ফিরে আসবে আনোয়ার হোসেনের নামও। কারণ যে চরিত্র তাকে ‘নবাব’ বানিয়েছিল, সেই নবাবই তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর করে দিয়েছে।