এক জায়গায় নয়, একই দিনে রাজধানীসহ দেশের একাধিক এলাকায় ঝটিকা মিছিল। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের এমন সমন্বিত তৎপরতায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—পুলিশের টহল ও সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও এতগুলো মিছিলের খবর আগে থেকে কেন জানা গেল না?
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর ঢাকা, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পৃথক ঝটিকা মিছিল বের করেন। এসব ঘটনায় ককটেলসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মিছিলে অংশ নেওয়া অন্যদের শনাক্ত করতে অভিযানও চলছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মিছিল শুরুর আগে সুনির্দিষ্ট সময় ও স্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে মিছিল শুরু হওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে তা ছত্রভঙ্গ করা এবং পরে সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবি দেখে জড়িতদের শনাক্ত করার পথেই এগোতে হচ্ছে পুলিশকে।
রাজধানীর গুলশান থানার ৩ নম্বর রোডের কেএফসি গলি এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল করেন। পুলিশ বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় তিনটি ককটেল ফেলে পালিয়ে যায় মিছিলকারীরা।
পরে ঘটনাস্থল থেকে ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আব্দুর রহিম (৪২) ও আশরাফ ইসলাম নিহাল (১৯) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের হিসাবে মিছিলে শতাধিক থেকে দুই শতাধিক মানুষ ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা ছিল আরও বেশি। শুক্রবারের ঘটনাগুলোর মধ্যে গুলশানের মিছিলটিকেই সবচেয়ে বড় বলে দাবি করা হচ্ছে।
শুধু ঢাকা নয়, একই সময়ে গাজীপুরেও মিছিলের চেষ্টা করা হয়। মহানগরের পূবাইল থানার টেকপাড়া এলাকায় সোবানি রিসোর্টের পেছনের সড়কে ছাত্রলীগের ২৫ থেকে ৩০ জন নেতাকর্মী ব্যানার নিয়ে মিছিলের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকায় সাবেক যুব ও ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে পৃথক দুটি ঝটিকা মিছিল বের হয়। পুলিশ ধাওয়া দিলে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশকে আগে থেকেই সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও কোথায়, কখন এবং কারা সংগঠিত হচ্ছে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।
পুলিশের নিজস্ব সোর্সের ওপর নির্ভর করে একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘবদ্ধ হওয়ার তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে মিছিল শুরু হওয়ার আগে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, নজরদারি বৃদ্ধি কিংবা সংশ্লিষ্টদের আটক করে কর্মসূচি ভণ্ডুল করার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকছে না।
এ পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিশেষ শাখা (এসবি) ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে মাঠপর্যায়ে তথ্য পৌঁছাতে কোনো ধরনের সমন্বয় ঘাটতি বা বিলম্ব হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝটিকা কর্মসূচির পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরকে ঘিরে বড় ধরনের কর্মসূচি বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা আছে কি না, সেটিও নজরে রাখা হচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানকে নেতাকর্মীদের ডিসেম্বরের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিতে দেখা গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।
একই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মিছিলের ঘটনায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও পুলিশের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকার পরও কীভাবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা একযোগে রাস্তায় নামতে পারলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে গুলশানের বড় জমায়েতের বিষয়ে আগাম তথ্য কেন পাওয়া গেল না, তা নিয়ে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে। কোথায় গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল এবং তথ্য থাকলেও তা মাঠপর্যায়ে যথাসময়ে পৌঁছেছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবারের ঘটনার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের যেকোনো ধরনের তৎপরতা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টহল ও সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
পুলিশের কর্মকর্তাদের মতে, মিছিল শুরু হওয়ার পর তা ছত্রভঙ্গ করার চেয়ে আগাম তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি কার্যকর। এ কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো দলের কার্যক্রম সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ঘটনায় গোয়েন্দা ঘাটতি থাকলে তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।