গ্রেপ্তার হচ্ছে খুনি তবুও থামছে না হত্যা, বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

শহরের ব্যস্ত সড়ক থেকে মফস্বলের নিরিবিলি জনপদ, কোথাও গুলি, কোথাও ধারালো অস্ত্রের আঘাত, কোথাও পিটিয়ে হত্যা। আবার কোথাও পারিবারিক বিরোধ,

2026-09-10T13:17:33+00:00
2026-09-10T13:17:33+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
শহর থেকে মফস্বল
গ্রেপ্তার হচ্ছে খুনি তবুও থামছে না হত্যা, বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা
শাকিল আহমেদ
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১৭ পিএম 
প্রতীকী ছবি
শহরের ব্যস্ত সড়ক থেকে মফস্বলের নিরিবিলি জনপদ, কোথাও গুলি, কোথাও ধারালো অস্ত্রের আঘাত, কোথাও পিটিয়ে হত্যা। আবার কোথাও পারিবারিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, মাদক, চাঁদাবাজি কিংবা অর্থের লোভে ঝরছে প্রাণ। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জনমনে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। হত্যার পর মামলা হচ্ছে, আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে, রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু থামছে না প্রাণঘাতী এই সহিংসতা।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় একই সময়ে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত। একই সময়ে যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে একজন নিহত, শাহ আলীতে ছুরিকাঘাতে তরুণের মৃত্যু এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গুলি ও কোপানোর ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে জননিরাপত্তা নিয়ে।

এসআই আলতাফ হত্যায় গ্রেপ্তার : সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকায় গত শনিবার দিবাগত রাতে হামলার শিকার হন এসবির উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেন (৫৮)। পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, একটি হামলা ঠেকাতে গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করে। মামলার প্রধান আসামি জহুরুলকে আদালতে হাজির করা হলে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। একই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১১ জন। র‌্যাবের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলতাফকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে জনসমক্ষে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা ও তাঁর মৃত্যুর ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রাজধানীতে প্রকাশ্যেই অস্ত্রের ব্যবহার : সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে রাজধানীতে প্রকাশ্য স্থানে অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে গুলিতে ইমরান হোসেন (৪০) নিহত হয়েছেন। শাহ আলীতে ২৫ বছর বয়সী মেহেদী হাসানকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় একজনকে আটক করেছে পুলিশ। হত্যার পেছনে ছিনতাই নাকি পূর্বশত্রুতা—তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায়।

এ ছাড়া ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুখে টেপ লাগানো অবস্থায় ইসমাইল হোসেনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বাসের চালক, সুপারভাইজার ও সহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, ইসমাইলের কাছে থাকা প্রায় আড়াই লাখ টাকা লুটের উদ্দেশ্যে তাঁকে বাসের ভেতর হত্যা করা হয়।

এসব ঘটনায় বোঝা যায়, রাজধানীর সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক বা স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ছিনতাই, অর্থের লোভ, মাদক ও ব্যক্তিগত বিরোধও বড় ভূমিকা রাখছে।

মফস্বলেও প্রতিশোধের আগুন : রাজধানীর বাইরে চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। পাবনার আটঘরিয়ায় তমা খাতুন হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও সাবেক ইউপি সদস্য আদম আলীকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামিই পরে আরেক হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ায় প্রতিশোধের চক্র কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকলে এ ধরনের সহিংসতা আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রামেও সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্য ও অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। রাউজানে এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় অস্ত্র হাতে গুলি ছোড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। খুলশীতে হিজড়া সম্প্রদায়ের ‘গুরুমা’ হিসেবে পরিচিত মৌসুমি হত্যার ঘটনাতেও গ্রেপ্তার ও তদন্ত চলছে।

চার খুনের রহস্যে মাদক-যোগ : এদিকে রংপুরের শিক্ষক চক্রবর্তী পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের রহস্যও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তদন্তে মাদক কেনাবেচা ও ইয়াবা সংগ্রহের বিষয় উঠে এসেছে। মামলার একজন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে হত্যার মূল উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের পেছনেও শুধু পারিবারিক বিরোধ নয়; মাদক, অর্থনৈতিক সংকট, ঋণ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা অপরাধী চক্রের প্রভাব থাকতে পারে।

ঘরের ভেতরেও নিরাপত্তার প্রশ্ন : আশুলিয়ার মধ্য জামগড়া এলাকায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ এবং পাঁচ মাসের একটি মৃত ভ্রূণ উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ ঘরটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। নিহত দম্পতির কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু শুধু একটি ফৌজদারি মামলার ঘটনা নয়; এটি মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—নিজের ঘর—কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।

মাদক-অস্ত্র-চাঁদাবাজিই বড় জ্বালানি : সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে আসে। এরই মধ্যে- মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, স্থানীয় আধিপত্য, পূর্বশত্রুতা, অর্থের লোভ ও পারিবারিক বিরোধ। বিশেষ করে মাদককে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের বিস্তারের সঙ্গে অস্ত্র, অর্থ ও আধিপত্যের লড়াইও বাড়ছে। অন্যদিকে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা ছোটখাটো বিরোধকেও মুহূর্তে প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত করছে। একটি তর্ক, সামান্য বিরোধ কিংবা পুরোনো শত্রুতার জেরে মুহূর্তেই ব্যবহৃত হচ্ছে গুলি বা ধারালো অস্ত্র।

গ্রেপ্তার হচ্ছে, কিন্তু থামছে না : সাম্প্রতিক প্রতিটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে, রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে, মামলা হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেই অন্য এলাকায় ঘটছে নতুন হত্যাকাণ্ড। এখানেই বড় প্রশ্ন—অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

অপরাধপ্রবণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ধারাবাহিক অভিযান, মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং স্থানীয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুধু সরাসরি হামলাকারী নয়, নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও অস্ত্র সরবরাহকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ একজন খুনিকে গ্রেপ্তার করলেই একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়; কিন্তু একই চক্রের নেপথ্যের শক্তি অক্ষত থাকলে নতুন হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকি থেকেই যায়।

সাভারে পুলিশ কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনের মৃত্যু, ঢাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাত, পাবনায় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড, রংপুরে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু কিংবা আশুলিয়ায় দম্পতি ও ভ্রূণের মরদেহ—ঘটনাগুলো আলাদা হলেও একটি জায়গায় এসে মিলে যায়। তা হলো মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (অপরাধ বিশেষজ্ঞ) ড. তৌহিদুল হক ভোরের ডাক’কে বলেন, শুধু মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ড দিয়ে এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। হত্যার পেছনে থাকা মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও প্রতিশোধের চক্র ভাঙতে হবে। তদন্তে গতি আনতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। 

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে পুলিশ। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। তবে অপরাধ সংঘটনের আগে সাধারণ মানুষ পুলিশকে জানালে অনেক অপরাধ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন পুলিশের আই কর্মকর্তা। তিনি আর বলেন আইনশৃঙ্খলা নিরাপদ রাখতে দেশের প্রতিটি থানা এলাকায় কাজ করে করে যাচ্ছে পুলিশ সদস্যরা। এ ছাড়া ডিএমপি’র প্রতিটা বিভাগে টহল, পেট্রোলিং, ফিক্সড টিমসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও নিজ বক্তব্যে যোগ করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: