সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আশির দশকে ফিরে যাওয়ার’ যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সরকারও যেন সেই প্রবণতার সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ট্রেন্ড শুরু হয়েছে—সবাই যেন আশির দশকে ফিরে যেতে চাইছে। এই সরকারকে দেখেও মনে হচ্ছে, তারাও যেন আশির দশকে ফিরে যেতে চাইছে। আশির দশকে তো এমন গ্যাস-বিদ্যুৎ ছিল না। মনে হচ্ছে সরকারও সোশ্যাল মিডিয়ার এই ট্রেন্ডের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছে। তবে সরকার ট্রেন্ডের সঙ্গে থাকুক, কিন্তু তা যেন ইতিবাচকভাবে হয়।’
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির আয়োজনে ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারুণ্যের রাজনৈতিক ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, পুরো পৃথিবী যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ যেন কোনোভাবেই পিছিয়ে না পড়ে—এটাই সবার প্রত্যাশা। বিশেষ করে বড় একটি গণঅভ্যুত্থান, রক্তদান ও আত্মত্যাগের পর এ প্রত্যাশা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
গণঅভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঘিরে সরকারের বিশেষ নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য শুধু উচ্চশিক্ষা দেওয়া নয় উল্লেখ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের চিন্তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
সম্প্রতি সংসদে একটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠার পর আরও কয়েকটি জেলায় একই ধরনের দাবি ওঠার প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতেও প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা গেছে।
তাঁর অভিযোগ, আগের শাসনামলে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুধু একটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিকল্পনা ও সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কিংবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোরও নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও রূপকল্প ছিল।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে বরিশাল অঞ্চলকে নেতৃত্ব দেবে এবং জাতীয় পর্যায়ে কী অবদান রাখবে, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
তিনি বলেন, ৭১টি জেলায় কেবল স্নাতক তৈরি করার চেয়ে গবেষণাভিত্তিক ১০টি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমূল পরিবর্তন ছাড়া তরুণদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সরকারি চাকরির ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর সাম্প্রতিক প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভাইভার নম্বর প্রায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব উদ্বেগজনক। অথচ নির্বাচনের আগে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভাইভার নম্বর ৫০-এ নামিয়ে আনার কথা বলেছিলেন।
ক্ষমতায় এসে এর বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের দ্বৈত নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সময়ে মানুষের মধ্যে যেমন হতাশা ও না পাওয়ার বেদনা রয়েছে, তেমনি অনেক আশাও রয়েছে।
তিনি বলেন, দুই বছরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। নির্বাচিত সরকারের অনেক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা জনগণই বিচার করবেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, এনসিপি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের দল। তাঁদের গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতা নিয়েই দলটি সামনে এগিয়ে যেতে চায়।
আলোচনা সভায় এনসিপি ও জাতীয় ছাত্রশক্তির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।