প্রায় দেড় যুগ ক্ষমতার বাইরে থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠন করছে বিএনপি। ক্ষমতার মসনদে বসতেই দলের শীর্ষ ও নীতিনির্ধারণী সারির নেতাদের সিংহভাগই এখন বঙ্গভবন, সচিবালয় ও সংসদীয় দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। এর ফলে দলীয় সাংগঠনিক রাজনীতিতে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এবং তৃণমূলের একাংশের বেপরোয়া ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড রুখতে এবার শুদ্ধি অভিযানে নেমেছে বিএনপির হাইকমান্ড। দীর্ঘ ১ দশকের বেশি সময় পর আগামী ডিসেম্বরে বহুল প্রতীক্ষিত সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা রয়েছে। এই কাউন্সিলকে সামনে রেখে কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে একদিকে যেমন মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিতর্কিত কমিটি ভাঙার তোড়জোড় শুরু হয়েছে অন্যদিকে ‘ক্লিন ইমেজধারী’ নেতৃত্বও খুজছে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।
ক্ষমতার রাজনীতিতে ফেরার পরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি ও ‘মব’ সংস্কৃতির অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের কিছু সুযোগসন্ধানী নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এতে করে সরকার ও দলের দীর্ঘ ত্যাগের অর্জন এক লহমায় প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কায় পড়েছে। সরকারের গৃহীত নানা জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ যাতে নিজস্ব নেতাকর্মীদের অপকর্মের ছায়া না পড়ে, সে বিষয়ে এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি। গত ৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় এ নিয়ে কঠোর বর্তা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, আমার এই প্রিয় দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যেন এমন কোনো কাজ করতে না পারে, যা সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ হয় এবং দল বিব্রত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
জনতার চোখে দলের সম্মান রক্ষা করতে বেপরোয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে সম্প্রতি বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অপকর্ম করে কেউ পার পাবে না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো রেয়াত দেওয়া হবে না। ভাবমূর্তি উদ্ধারে চিহ্নিত সুবিধাবাদী, নিস্ক্রিয় ও বিতর্কিতদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে পরীক্ষিত ও ত্যাগীদের নেতৃত্বে আনার ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে তারেক রহমানের হাইকমান্ড।
তবে কয়েকটি স্থানে তৃণমূল পুনর্গঠনের বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পকেট কমিটি’ (টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি)। চট্টগ্রাম, ফেনী ও মোংলাসহ একাধিক এলাকায় রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম করা নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন ও অর্থের বিনিময়ে কমিটি দখলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের অসন্তোষের আগুন নেভাতে দলীয় প্রধান তারেক রহমান সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, টাকার জোরে বা ব্যক্তিস্বার্থে তৈরি কোনো ‘পকেট কমিটি’ ঠাঁই পাবে না। দেড় দশকের জুলুম-নির্যাতন সয়ে যারা দলের পতাকা আঁকড়ে ধরেছিলেন, নেতৃত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কেবল তারাই প্রাধান্য পাবেন। ইতিমধ্যে ফেনী জেলা যুবদলের কমিটি বিলুপ্তিসহ একঝাঁক বিতর্কিত নেতাকে বহিস্কার করে সেই কঠোর বার্তা দৃশ্যমান করা হয়েছে।
সাংগঠনিক কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে এবার আর ওপর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না; বরং কার্যকর করা হচ্ছে ‘বটম-আপ’ বা তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিশেষ প্রক্রিয়া। নতুন ছক অনুযায়ী, প্রথমে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে প্রত্যক্ষ কাউন্সিল শুরু হয়ে ইউনিয়ন ও থানা পার করে সবশেষে জেলা নেতাদের উপস্থিতিতে রূপ নেবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। এই বিশাল পরিবর্তন তদারকি ও নজরদারির জন্য গঠিত হচ্ছে একটি শক্তিশালী ‘মনিটরিং অ্যান্ড ডিজাইন কমিটি’।
জ্যেষ্ঠতার অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সংমিশ্রণে নতুন ধারার এই দলীয় সংস্কার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যা সেলিমা রহমান ভোরের ডাককে, নতুন সরকারের আদলেই দলের মধ্যেও জেষ্ঠদের পাশাপাশি পরীক্ষিত তরুণ নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃত্বে আনা হবে। তবে এক্ষেত্রে বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হবে না।
এদিকে প্রতি তিন বছর পর দলীয় কাউন্সিল আয়োজনের কথা থাকলেও বিগত এক দশকের প্রতিকূল রাজনীতিতে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চের পর আর জাতীয় কাউন্সিল সম্ভব হয়নি। ফলে এবারের সপ্তম কাউন্সিল শুধু একটি রুটিন আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দলের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা কাটানোর সুযোগ। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের অচলবস্থা কাটাতে বড় ধরনের রদবদলের ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। একই সাথে স্থায়ী কমিটির শূন্য ৫টি পদ পূরণ এবং দলের দূর্দিনের কাণ্ডারী হিসেবে পরিচিত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীকে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব প্রদান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
মূলত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই ঘর গোছাতে মাঠে নেমেছে বিএনপি। সংসদ সদস্য ও তৃণমূলের দূরত্ব ঘুচিয়ে সাংগঠনিক ঐক্য ফেরাতে খোদ তারেক রহমান মাঠপর্যায়ের নেতাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। ক্ষমতার উত্তাপ সামলে বিএনপি নিজেদের কতটা সুসংগঠিত ও কর্মীবান্ধব রাখতে পারে, আসন্ন কাউন্সিলেই হবে তার চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা।