ইতালির মেস্ট্রেতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে আঘাতের অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনা চলছে। ঘটনার প্রতিবাদে দেশের অভিনয়শিল্পী, শিক্ষক, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সোচ্চার হয়েছেন। তবে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়েছে ভিন্নমতও।
বাঁধন অভিযোগ করেছেন, ইতালিতে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি তাকে হেনস্তা করেন। তাঁর গায়ে পানি, কোক ও অন্যান্য পানীয় ছোড়া হয় এবং শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়। একই সঙ্গে তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলানোর চেষ্টা এবং তাঁর ফোন ফেলে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
সোমবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ভিডিওবার্তায় বাঁধন জানান, ঘটনার সময় তাঁর ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও চার বছরের কম বয়সী একটি শিশুও সঙ্গে ছিল। হামলার ঘটনায় শিশুটি ভয় পেয়ে কান্না করছিল বলেও জানান তিনি।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে একটি বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নিয়ে ইতালিতে অবস্থান করছেন বাঁধন। আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের মধ্যে তাঁকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে আসায় দ্রুত বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তারকাদের প্রতিবাদ
বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারজিস আলমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাঁধনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং অভিযুক্তদের সমালোচনা করেন।
অভিনেত্রী জাকিয়া বারী মম দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নারীর প্রতি অসম্মান, ভিন্নমতের মানুষের ওপর নির্যাতন ও রাজনৈতিক সহিংসতার সমালোচনা করেছেন।
মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুলও নারী ও শিল্পীদের প্রতি মানুষের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, মানুষের প্রকৃত উন্নতি বোঝা যায় অন্যকে কতটা সম্মান ও মানবিকতা দেখাতে পারে, তার ওপর।
চিত্রনায়িকা পরীমণি ঘটনার ভিডিও শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ঘটনার সময় ছোট শিশুটির কান্নার বিষয়টি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছে।
অভিনেত্রী সাফা কবির বলেন, দেশের বাইরে কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে একজন শিল্পী যখন নিজের কাজ ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা। অপমান, হয়রানি বা আতঙ্ক নয়।
‘তবে দেশে মব-হেনস্তার সময় প্রতিবাদ কোথায় ছিল?’
বাঁধনের প্রতি সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অংশ অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গও তুলছে। তাদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে মানুষকে হেনস্তা বা আক্রমণের শিকার হতে হলেও তখন একই মাত্রায় প্রতিবাদ দেখা যায়নি কেন।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন মব-হেনস্তার ঘটনা এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় নারীসহ বিভিন্ন মানুষের হয়রানির প্রসঙ্গ সামনে আনছেন অনেকে।
তাদের বক্তব্য, বাঁধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সহিংসতা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে একই ধরনের ঘটনা দেশে ঘটলে তার বিরুদ্ধেও সমানভাবে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। একজন তারকা ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিবাদের মানদণ্ড আলাদা হওয়া উচিত কি না—এ নিয়েও চলছে আলোচনা।
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত করে দেখেছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেওয়া বাঁধন সেখানে এক অর্থে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রতিশোধ বা ‘টিট ফর ট্যাট’ ধরনের রাজনীতি কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে দেশের বাইরে থাকা চিত্রনায়ক সাইমন সাদিকও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিল্পী ও ব্যক্তিদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় এবং মব-সংস্কৃতির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন আওয়ামী লীগের রাজনীতিরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি প্রতিশোধ ও সহিংসতার পরিবর্তে জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা ও সহনশীল রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে বাঁধনকে হেনস্তার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক এখন শুধু একজন অভিনেত্রীর ওপর হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মব-সংস্কৃতি, শিল্পীদের নিরাপত্তা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সবার জন্য একই মানদণ্ড থাকা উচিত কি না—সেই প্রশ্নও।