নানা কারণে রাজধানীতে বাড়ছে পথশিশুর সংখ্যা। এর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন সংগঠনের মতে অন্তত চার লাখ পথশিশু রয়েছে। তাদের রোদ বৃষ্টিতে পথে প্রান্তরেই দিন কাটে। সুবিধা বঞ্চিত এসব পথশিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সম্প্রতি ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ চালু করেছে দক্ষিণ সিটি। এতে বিভিন্ন স্থানের পথশিশুরা বর্জ্য জমা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের মাঝে অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের (এসটিএস) সুবিধাজনক স্থানে পথশিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াতে চেয়ার-টেবিল ও বইসহ ‘বই পড়ার বিনিময়ে খাবার’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দক্ষিণ সিটি। ফলে শিগগিরই পথশিশুরা শিক্ষার আওতায় আসছে।
দক্ষিণ সিটির এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সাধারণ মানুষ। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনকেও (ডিএনসিসি) এর ধরনের উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাহলে এসব শিশুরা বড় হয়ে নিদেজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। এতে কমবে চুরি ছিনতাইসহ নানা অপরাধের প্রবণতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে নগরায়নের সাথে সাথে পথশিশুর সংখ্যা এবং তাদের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। পথশিশুদের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘একশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি)’এর মতে, নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ঢাকায় আনুমানিক চার লাখ পথশিশু আছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশের বসবাস। এসব পথশিশুদের মধ্যে ৮২ শতাংশ ছেলে এবং ১৮ শতাংশ মেয়ে। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী পথশিশু রয়েছে ৫৪ শতাংশ। এছাড়াও পথশিশুদের ১২ শতাংশই মাদকাসক্ত। বাকিরা কোন না কোন অপরাধের সাথে জড়িত। তারা সুষম খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সেবা ঠিকমতো পায় না। ফলে, তারা বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত তারা। এসব পথশিশুদের কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, কিছু পথশিশু যারা ২৪ ঘণ্টাই রাস্তায় থাকে। তাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। এ ধরনের পথশিশুদের বেশিরভাগ হয় এতিম নয়তো বাবা-মা তাদের ফেলে রেখে গেছে (পরিত্যক্ত)। দ্বিতীয়ত, কিছু পথশিশু যাদের পরিবার আছে। তারা দিনের বেলা রাস্তায় থাকলেও রাতে পরিবারের সাথে বাসায় বা অন্য কোথায়ও থাকে। তৃতীয়ত, কিছু পথশিশু যারা পরিবারসহ রাস্তাতেই থাকে। এরাই একসময় নানা ধরনের অপরাধে সাথে জড়িয়ে পরে। ফলে এদের খাদ্য, শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরী। ফলে দক্ষিণ সিটি কর্তৃক পথশিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াতে যে পরিকল্পনা রয়েছে তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, পথশিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াতে বই পড়ায় উৎসাহিত করতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ সিটি। বই পড়ার বিনিময়ে খাবার দেওয়ার কর্মসূচি চালুর কথা ভাবছে সংস্থাটি। পাশাপাশি নানা সুযোগ সুবিধাও থাকবে তাদের জন্য। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন পাঠাভ্যাস বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে, অন্যদিকে শিশুদের জন্য তৈরি করা হবে আনন্দময় ও ইতিবাচক পরিবেশ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বই পড়া কিংবা পাঠ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পর শিশু-কিশোরদের জন্য খাবার ব্যবস্থা রাখা হবে। প্রথমত এসটিএস এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে নগরীর বিভিন্ন পাঠাগার, কমিউনিটি সেন্টার ও নির্ধারিত স্থানে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরস্কার বা খাবারের মতো প্রণোদনা দিয়ে শুরুতে পথশিশুদের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা গেলে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পাঠাগারকেন্দ্রিক সামাজিক পরিবেশও গড়ে উঠবে। এতে তারা বড় হয়ে নিজেরাই ভালো কিছু করতে পারবে। ফলে নগরীতে অপরাধ প্রবণতা কমবে। তবে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের আগে এর কাঠামো, বাজেট, বই নির্বাচন এবং অংশগ্রহণের নিয়ম নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিশুদের হাতে বয়স ও মানসিক বিকাশের উপযোগী বই পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিতে হবে। দক্ষিণ সিটির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নগরীর শিশু-কিশোরদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়বে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। এখন পরিকল্পনাটি কবে নাগাদ বাস্তব রূপ পায়, সেটিই দেখার বিষয়। পথশিশুদের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠান একশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (এএসডি) এর উপ-নির্বাহী পরিচালক মোজাম্মেল হক জানান, বেশিরভাগ মেয়ে পথশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়। তাদের বেশিরভাগ এসটিডিতে (যৌনবাহিত রোগ) আক্রান্ত। তারমতে, খাদ্য, শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি, কাউন্সেলিং, জীবনমুখী প্রশিক্ষণ, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, বিনোদন এবং পরিবারের সাথে রাখা এসব পথশিশুদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে জরুরি। দক্ষিণ সিটির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ‘বর্জ্যরে বিনিময়ে বাজার’ ব্যবস্থা চালু করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় এসটিএস সুবিধাজনক স্থানে পথশিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াতে চেয়ার-টেবিল ও বইসহ ‘বই পড়ার বিনিময়ে খাবার’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আশাকরি শিগগিরই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে।