তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে চরম উত্তেজনা। রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ক্যাম্পাসগুলোতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটলেও বর্তমানে সাধারণ তর্কাতর্কি, দরজার ছিটকিনি আটকানোর মত অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়েও বাড়ছে উত্তেজনা, ঘটছে সংঘর্ষ। গত ৪ দিনে ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আগের মাসে অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। এসব ঘটনায় রামদা, লাঠিসোঁটাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্য মহড়া ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে ভোরের ডাককে বলেছেন, তুচ্ছ বিষয়ে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মারামারি, কাটাকাটি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা অনেক ধৈর্য নিয়ে শিক্ষাজীবনের একযুগ পার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। কথা কাটাকাটি কিংবা রাগ-ক্ষোভ তাদের হজম করা উচিৎ। তা না হলে তারা কিভাবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিবে, কিভাবে সমাজ পরিবর্তন করবে। ক্যাম্পাসের ছাত্রনেতারাও আমাদের ছাত্র, আমরা তাদের পড়াই। তাদের অস্ত্র নিয়ে শো ডাউন দেখা আমাদের জন্য লজ্জ্বাজনক ও বিব্রতকর।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের মহড়া: গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) কথা কাটাকাটির জেরে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) হল শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরকে থাপ্পড় মারে এক ছাত্রদল নেতা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী জুহায়েরের পায়ের লিগামেন্টে সমস্যা থাকায় তিনি ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন। হলের গেট পেরিয়ে করিডরে পৌঁছালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলীনূর রহমান তাঁকে আচমকা থাপ্পড় মারেন ‘বেয়াদব’ বলে গালি দেন। আলীনূর পরবর্তীতে চড় মারার কথা স্বীকারও করেছেন। এই ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে শিবিরের নেতা-কর্মীরা আলীনূরের কক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর করে এবং দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে প্রক্টরিয়াল বডির গাড়ি থেকে আলীনূরকে শিবিরের কর্মীরা নামানোর চেষ্টা করে কিলঘুষি মারে ও গাড়ির কাচ ভাঙচুর করে। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে বহিরাগত ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মহড়া দিতে দেখা যায়। একই সময়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে জামায়াত-শিবির কর্মীরাও ক্যাম্পাসের পকেট গেট ও জিয়া মোড়ে অবস্থান নেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়। দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার ছবি, ভিডিও ফুেিটজ দেশজুরে ভাইরাল হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি নজরে আসেনি বলে দাবি করেছে।
ছিটকিনি আটকানো নিয়ে ববিতে উত্তেজনা: গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ক্যাম্পাসের বাইরের একটি মেসে সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দরজার ছিটকিনি আটকানো নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই অতি তুচ্ছ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ক্যাম্পাসের ৩ নম্বর গেট, ভিসি গেট ও ভোলার রোড এলাকায় মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় জড়ায়। পরে শিক্ষকরা গিয়ে রাত সোয়া ১১টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘাত: গত ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ কথা কাটাকাটির জেরে মধ্যরাতে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। অগ্নিবীণা ও বিদ্রোহী হলের মধ্যবর্তী এলাকায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে উভয় পক্ষের মহড়া ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় থিয়াটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী লাবিবসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পর হলের নিরাপত্তা জোরদার করে প্রক্টরিয়াল টিম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
গত মাসে অন্তত ১০ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষ: গত আগস্টের শুরুর দিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত ১০টি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ব্যাপক সংঘাত ঘটে। গত ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল সংসদের সহ সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ইব্রাহীম খলিলের কক্ষ থেকে ‘সমকামিতায়’ লিপ্ত থাকা অবস্থায় দুজন অতিথিকে আটক করা হয়। এ নিয়ে ওই দিন বিকেলে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরে তারা ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি শোডাউন দিতে দেখা যায়।
এর পরদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বিতর্কিত বিলবোর্ড ও প্রদর্শনী ব্যানার সরানো নিয়ে ছাত্রদল-শিবির দুই পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২৫ জন আহত হন। পরে শোডাউন দিয়ে শিবির নেতাদের বলতে শোনা যায়, রংপুরে ছাত্রদলের নাম রাখা হবে না। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দর্শনার্থী প্রবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
৪ আগষ্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা চলছিল। সে সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) কয়েকজন প্রতিনিধি, জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা কয়েকটি প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মী ও প্রক্টরিয়াল বডি তাঁদের বাধা দেন। এরপর তাঁরা মিলনায়তনের সামনে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে পড়েন। পরে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবির, জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়। পরে তারা নিকটস্থ ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও কয়েক দফা সংঘর্ষ ঘটে। পুরো ঘটনায় ৭০ জনেরও বেশি আহত হন।
ঢাকা কলেজেও জুলাইয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হয়। তখন ক্যাম্পাসে শিবিরকে রাজনীতি করতে দেবে না বলে শাখা ছাত্রদল ঘোষণা দেয় । এছাড়া সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, বরিশাল বিএম কলেজেও হল দখল ও কক্ষ থেকে কর্মীদের বের করে দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও মারামারি হয়।