আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি নতুন পাঠ্যবই তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ শেষ করে মাঠপর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্য থাকলেও সাম্রতিক লাগাতার লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আগষ্ট মাস থেকে কারখানাগুলোতে পুরোদমে কর্মযজ্ঞ চলার কথা থাকলেও তীব্র লোডশেডিংয়ের কারনে অনেক ছাপাখানায় কাজ চলে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘন্টা। লোডশেডিংয়ের সময়ে অসংখ্য ছোট-মাঝারি ছাপাখানাগুলো বন্ধ থাকছে আবার বড় কিছু প্রতিষ্ঠানে জেনারেটরের মাধ্যমে কাজ চলছে। ফলে বছরের প্রথম দিন দেশের ৪ কোটির বেশি শিক্ষার্থীর হাতে শতভাগ বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ছাপাখানা এলাকায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবারহে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের হস্তক্ষেপ চেয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
সরোজমিনে খোজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীতে অল্প লোডশেডিং থাকলেও রাজধানীর বাইরের ছাপাখানাগুলোতে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে উৎপাদন অবস্থা বেহাল। কেরানীগঞ্জের মহানগর প্রিন্টিং প্রেসে নেই নিজস্ব জেনারেটর। বিদ্যুৎ আসলে ছাপার কাজ শুরু করে, আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ থাকে। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তাদের প্রচুর কাগজ অপচয় হচ্ছে বলে জানান সেখানকার কর্মচারীরা। একইভাবে মহানগর প্রিন্টার্স, সৃষ্টি প্রিন্টার্স, বনমালা, বনশিখা, এসএস প্রিন্টিং প্রেসসহ নানা প্রতিষ্ঠানে একই চিত্র দেখা গেছে।
মোল্লা প্রিন্টার্স, ন্যাশনাল প্রিন্টার্স, অটো প্রিন্টার্স, ঢাকা মুদ্রণ, প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসে জেনারেটরে চলছে ছাপার কাজ। বিদ্যুৎ ও জেনারেটর সংযোগে নিয়মিত মেশিন বন্ধ ও চালু করায় অনেক কাগজ নষ্ট হচ্ছে। অনেক ফর্মাও বাতিল হচ্ছে। একদিকে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, অন্যদিকে কাগজ ও ফর্মা নষ্ট এ যেন মরার উপরে খরার ঘা। প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসের মালিক মো. মহসিন বলেন, প্রতিদিন গড়ে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালিয়ে ছাপার কাজ চালু রাখতে গিয়ে প্রতিদিন শুধু তেলের পেছনেই অতিরিক্ত ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। জেনারেটর টানা তিন-চার ঘণ্টা চালানোর পর গরম হয়ে গেলে সেটি ঠান্ডা করার জন্য কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এতে উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটছে।
গত ২৩ আগস্ট এনসিটিবির পক্ষ থেকে ডিপিডিসি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসহ অন্যান্য বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে ছাপাখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।
এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক উইংয়ের সদস্য প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু ভোরের ডাককে বলেন, প্রয়োজনে আমাদের বাসায় বিদ্যুৎ কম দিয়ে কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সচল রাখা হোক। আমরা আমাদের জায়গা থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে সমন্বয়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিদ্যুৎ বিভাগে ফোন গেলে বিষয়টা অনেক বেশি গুরুত্ব পেত। আমরা তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ভোরের ডাককে বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ যে কয়টি এলাকায় বইয়ের ছাপাখানা রয়েছে সেগুলোতে বিদ্যুতের নিদিষ্ট জোন সিলেকশন করেছি। এসব জোনে বিদ্যুৎ সরবারহের দায়িত্বে ডিপিডিসি নাকি পল্লী বিদ্যুৎ, তা নির্ধারণ করে এনসিটিবির পক্ষ থেকে চিঠি দিয়েছি। জিএম-ডিজিএমদের সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছি। বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে কথা বলতে আমরা শিক্ষা মন্ত্রনালয়কেও অভিহিত করেছি।
তিনি বলেন, আমরা গত বছরের চেয়েও ১ মাস ৭ দিন পূর্বে বই মুদ্রণের উদ্যোগ নিয়েছি। লোডশেডিংয়ের কারনে অনেক কারখানায় জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখছেন। এসব প্রতিকুলতার মধ্যেও আমরা আশা করছি ৩০ নবেম্বরের মধ্যেই বই বুঝে পাবো। তবে ২/১ দিন এদিক ওদিক হতেই পারে।
অতীতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরের শুরুতে আংশিক বই এবং পর্যায়ক্রমে অল্প দিনের মধ্যে সকল বই হাতে পাওয়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ছিল। এবার এই রেওয়াজ দূর করতে এনসিটিবি আগেভাগেই মুদ্রণের রোডম্যাপ তৈরি করেছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ শুরু করে। ইতোমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের বই মুদ্রণ শুরু হয়েছে। এছাড়া গত ৩১ আগস্ট মাধ্যমিক স্তরের বই মুদ্রণের জন্য ছাপাখানাগুলোর সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়, যা ৭০ দিনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞে এখন প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সংকট।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক এবং কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিশাল কর্মসূচিতে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৪৩ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৫১৪ টাকা। এনসিটিবির স্তরভিত্তিক বরাদ্দ অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৮ কপি বই মুদ্রণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি স্তরের জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি পাঠ্যবই মুদ্রণে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয় হবে ১ হাজার ১৮৩ কোটি ৩৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এছাড়া ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যক্রমে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে ইতিহাসের বিচ্যুতি সংশোধন করা হচ্ছে এবং চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি বই। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের খেলাধুলা ও সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় পড়াশোনা’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইগুলো নতুন শিক্ষাক্রমে যুক্ত হবে।
প্রেস মালিক ও সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জেনারেটর দিয়ে সাময়িকভাবে কাজ চালানো গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এবং উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়ায়। এতে ছাপার মানও খারাপ হয়। তাই সরকার যদি দ্রুত মুদ্রণ এলাকাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে বছরের প্রথম দিনেই শতভাগ বই বিতরণের পরিকল্পনা পুনরায় বিঘ্নিত হতে পারে।