চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সব ঠিক থাকলে নভেম্বরের শুরুতে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণ শুরু হতে পারে। শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা, দুর্গাপূজা, রোজাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় রেখে ভোটের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) আগারগাঁওয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে ভোট শুরু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। চলতি মাসের মধ্যেই কোন ধাপে কতটি ইউনিয়নে এবং কখন ভোট হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা জানানো হবে।
দেশের সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপযোগী রয়েছে। সব ইউনিয়নে একসঙ্গে ভোট আয়োজন করা অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে কঠিন হওয়ায় ধাপে ধাপে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির সঙ্গেও এ পরিকল্পনা সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানান তিনি।
পরীক্ষার সময় এড়িয়ে ভোট
নভেম্বর ও ডিসেম্বর শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সময়। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এবং শিক্ষকরাই ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় পরীক্ষার সময় বিবেচনায় রেখে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করবে কমিশন।
ইসি জানিয়েছে, নভেম্বরের শুরুতে প্রথম ধাপের কিছু ইউনিয়নে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও অন্যান্য জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতিতে ‘না’
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দাবি তোলা হলেও কমিশনের পর্যবেক্ষণ—শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা শিক্ষাঙ্গনের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য অন্তরায় হতে পারে।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততা তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এর প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।
ইসি সরকারের চাপে রয়েছে—জামায়াতের এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন দাবি মূলত নির্বাচন কমিশনকে উল্টো রাজনৈতিক চাপে রাখার কৌশল।
পোস্টাল ভোটে প্রযুক্তির ব্যবহার
আসন্ন উপনির্বাচনগুলোতে ভোটারদের ভোটদানের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও আধুনিক করতে আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে সাধারণ ভোটারদের জন্য আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের।
ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি, বাড়বে বডি ক্যামেরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারচুপি ও সহিংসতা ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বডি-ওর্ন ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তার পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের কাজও চলছে। পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে কমিশন কাজ করছে বলে জানান আনোয়ারুল ইসলাম।
মিছিল-শোডাউন ও পোস্টারে কড়াকড়ি
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারণার ধরনেও বড় পরিবর্তন আসছে। নতুন আচরণবিধিতে দলীয় প্রতীক, নির্বাচনী মিছিল ও শোডাউনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকছে।
তফসিল ঘোষণা থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রকাশ্য নির্বাচনী মিছিল, র্যালি বা শোডাউন করা যাবে না। একইভাবে দেয়াল, ভবন, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, কালভার্ট বা মেট্রোরেলের পিলারে কাগজের পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।
তবে নির্দিষ্ট আকার ও পরিবেশবান্ধব উপকরণে তৈরি ব্যানার বা লিফলেট সীমিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হতে পারে।
সহিংসতা ঠেকাতে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক
ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার শুরু থেকেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ইসি। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সবার মতামত ও সহযোগিতার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করতে চায় কমিশন।
তিনি বলেন, কমিশনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কোনো আইনি জটিলতা না থাকলে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আর কোনো বড় ধরনের বিলম্ব বা প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। এরপর নভেম্বরের শুরু বা প্রথমার্ধে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।