সঙ্গীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হয়েছে। রাগ, অভিমান আর মানসিক উত্তেজনায় দুজনের কথা বলাই কঠিন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই ঝগড়ার পরই অনেকের সঙ্গীর আরও কাছে যেতে ইচ্ছা করে। তৈরি হয় যৌন আকাঙ্ক্ষাও। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, এর পেছনে কাজ করতে পারে শরীর ও মনের স্বাভাবিক কিছু প্রক্রিয়া।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ঝগড়ার সময় শরীরে তৈরি হওয়া তীব্র উত্তেজনার সঙ্গে যৌন উত্তেজনার কিছু শারীরিক মিল রয়েছে। হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাওয়া, শরীরে রক্তপ্রবাহ বাড়ার মতো প্রতিক্রিয়া দুই ক্ষেত্রেই দেখা যেতে পারে। ফলে রাগ, ভয় বা উদ্বেগ থেকে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কখনো কখনো যৌন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
সম্পর্ক হারানোর ভয়ও বাড়াতে পারে আকর্ষণ
ঝগড়ার সময় শুধু রাগ নয়, সঙ্গীকে হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় কিংবা সঙ্গী দূরে সরে যাওয়ার অনুভূতি মানুষের ভেতরে তীব্র আবেগ তৈরি করে। তখন নিজের অজান্তেই সঙ্গীর সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়তে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সম্পর্কের বন্ধন যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন মানুষের ‘অ্যাটাচমেন্ট সিস্টেম’ সক্রিয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ যে মানুষটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তার কাছেই আবার ফিরে যাওয়ার তাগিদ তৈরি হতে পারে।
ঝগড়ার পর কেন কাছে আসতে ইচ্ছা করে?
ঝগড়ায় তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্ব কমানোর একটি উপায় হিসেবে অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা কাজ করতে পারে। এ কারণেই ঝগড়ার পর যৌন ঘনিষ্ঠতাকে অনেক সময় ‘মেকআপ সেক্স’ বলা হয়।
যৌন ঘনিষ্ঠতার সময় শরীরে অক্সিটোসিনসহ কিছু রাসায়নিকের নিঃসরণ ঘনিষ্ঠতা ও সংযোগের অনুভূতি বাড়াতে পারে। ফলে ঝগড়ার পর তৈরি হওয়া নেতিবাচক আবেগ কিছুটা কমে গিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে আবার কাছাকাছি অনুভব করতে পারেন দুজন।
তীব্র আবেগের প্রভাব পড়ে যৌন আকাঙ্ক্ষায়
রাগ, ভয়, উদ্বেগ কিংবা উত্তেজনার মতো তীব্র আবেগ শরীরকে এক ধরনের সক্রিয় অবস্থায় নিয়ে যায়। এই শারীরিক উত্তেজনা পরবর্তী সময়ে যৌন আকাঙ্ক্ষাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এ কারণে ঝগড়ার পর ঘনিষ্ঠতা কারও কাছে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি তীব্র বা আবেগপূর্ণ মনে হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে একঘেয়েমি থাকলে তীব্র আবেগের পর ঘনিষ্ঠতা নতুন ধরনের উত্তেজনাও তৈরি করতে পারে।
গবেষণাতেও মিলেছে এমন ইঙ্গিত
২০০৮ সালে ইসরায়েলের বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় সম্পর্কের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকির অনুভূতি তৈরি হলে সঙ্গীর প্রতি যৌন আগ্রহ বাড়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গী অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন—এমন পরিস্থিতি কল্পনা করতে বলা হয়েছিল।
গবেষণাটির ফলাফল থেকে ধারণা করা হয়, সঙ্গীকে হারানোর আশঙ্কা বা সম্পর্কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কখনো কখনো সঙ্গীর প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে যৌনতা ঝগড়ার সমাধান নয়
ঝগড়ার পর ঘনিষ্ঠতা সম্পর্ককে স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু এটিকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিবার দ্বন্দ্বের মূল কারণ এড়িয়ে শুধু শারীরিক ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিলে সমস্যাটি থেকেই যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি যে বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছে, সেটি নিয়েও শান্তভাবে কথা বলা জরুরি। আবেগ কিছুটা কমে গেলে দুজনের উচিত নিজেদের অনুভূতি ও সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা।
আর সম্পর্কের মধ্যে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন থাকলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন পরিস্থিতিকে সাধারণ দাম্পত্য ঝগড়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, তুমুল ঝগড়ার পরও সঙ্গীর প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া অনেকের ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক নয়। তীব্র শারীরিক উত্তেজনা, সম্পর্ক হারানোর ভয়, মানসিক সংযোগ ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজন—সবকিছু মিলেই এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে।