বিয়ের আগে পোশাক, আয়োজন ও নানা প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বর-কনে ও পরিবারের সদস্যরা। তবে এসবের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ দাম্পত্য জীবন ও সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও জরুরি। কারণ কিছু রোগের কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ না থাকলেও তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বা পরবর্তী সময়ে সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের আগে কয়েকটি সাধারণ পরীক্ষা করিয়ে নিলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে আগেই জানা সম্ভব। কোনো রোগ ধরা পড়লেও অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়।
১. থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা
বিয়ের আগে বর-কনের থ্যালাসেমিয়া বাহক কি না, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য রক্তের পরীক্ষা করা যায়। অনেক থ্যালাসেমিয়া বাহক নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করেন এবং কোনো উপসর্গও থাকে না।
তবে স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বিয়ের আগে পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২. হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা
হেপাটাইটিস বি লিভারে গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। আক্রান্ত অনেকের দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ফলে নিজের অজান্তেই সংক্রমণ অন্যের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিয়ের আগে দুজনেরই হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করা এবং ফলাফল অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
৩. হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা
হেপাটাইটিস সি মূলত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায় এবং দীর্ঘদিন নীরবে লিভারের ক্ষতি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে।
পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া যায়। বর্তমানে হেপাটাইটিস সি-এর কার্যকর চিকিৎসাও রয়েছে।
৪. এইচআইভি পরীক্ষা
এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির অনেক বছর কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, সংক্রমিত রক্ত বা একই সূঁচ ব্যবহারের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। মা থেকেও সন্তানের মধ্যে সংক্রমণ যেতে পারে।
তাই বিয়ের আগে এইচআইভি পরীক্ষা করানো হলে সংক্রমণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া সম্ভব।
৫. যৌনবাহিত রোগের পরীক্ষা
সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্লামিডিয়া ও ট্রিকোমোনিয়াসিসসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। চিকিৎসা না হলে পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা, এমনকি সন্তানধারণে সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বিয়ের আগে বর-কনের যৌনবাহিত রোগের পরীক্ষা করা যেতে পারে। রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৬. বন্ধ্যত্ব পরীক্ষা
বন্ধ্যত্ব সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী উভয়েরই বন্ধ্যত্ব পরীক্ষা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে পুরুষের শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ও সংখ্যা পরীক্ষা এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে পেলভিক আলট্রাসনোগ্রাফি ও বিভিন্ন হরমোন, যেমন থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন বা টিএসএইচ, প্রলেকটিন, টেস্টোস্টেরন, ফলিক্যাল স্টিমুলেটিং হরমোন বা এফএসএইচ, লুটিনাইজিং হরমোন বা এলএইচ ইত্যাদি পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
৭. রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর
স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ একই হলেই সমস্যা হবে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে বিশেষ করে নারীর রক্তের গ্রুপ আরএইচ নেগেটিভ হলে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে আরএইচ অসামঞ্জস্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তাই বর-কনের রক্তের গ্রুপ ও আরএইচ ফ্যাক্টর জানা থাকলে ভবিষ্যতে গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
৮. ক্রনিক রোগ স্ক্রিনিং
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা ইত্যাদি রোগের পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে পাত্র-পাত্রী দুজনেরই জেনে নেওয়া উচিত, কেউ এসব রোগে ভুগছেন কি না এবং অপরকে জানানো উচিত।
৯. বংশগত রোগের পরীক্ষা
বংশগত রোগগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তার লাভ করে। তাই বিয়ের আগে, বিশেষ করে নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের আগে বংশগত রোগের পরীক্ষা করানো উচিত।
১০. মানসিক রোগ
অনেকেই মনে করেন বিয়ে করলেই মানসিক রোগ ঠিক হয়ে যাবে, যা একেবারেই সঠিক নয়। সিজোফ্রেনিয়া, ডিপ্রেশন, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার ইত্যাদি মানসিক রোগ বিয়ের আগেই শনাক্ত করে চিকিৎসা করানো উচিত এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে তাঁদের বিয়ে দেওয়া উচিত।
রোগ ধরা পড়লেই বিয়ে বন্ধ নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরীক্ষার কোনো একটিতে সমস্যা ধরা পড়লেই বিয়ে করা যাবে না, এমন নয়। অনেক রোগেরই কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। আবার কিছু সংক্রমণ যাতে স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানের মধ্যে না ছড়ায়, সে জন্যও চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
তাই বিয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে অযথা ভয় না পেয়ে, রিপোর্টে কোনো সমস্যা এলে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ ও নিরাপদ দাম্পত্য জীবন এবং ভবিষ্যৎ সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতার বিকল্প নেই।
সুতরাং একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সুখী দাম্পত্য জীবনে প্রবেশ করতে হলে সামাজিক দিকগুলো বিবেচনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিকগুলো বিবেচনায় আনা জরুরি।