প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। দূরে থাকা মানুষকে মুহূর্তেই কাছে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনই কখনো কখনো সবচেয়ে কাছের মানুষটির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে দাম্পত্য সম্পর্কে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একসঙ্গে থাকার পরও যদি স্বামী-স্ত্রীর বড় একটি সময় কেটে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বা বিভিন্ন অ্যাপের পর্দায়, তাহলে ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে পারস্পরিক কথোপকথন ও মানসিক সংযোগ। সম্পর্কের ছোট ছোট অভ্যাস ও মুহূর্তগুলোই একসময় দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কাজ শেষে বাড়ি ফিরে সঙ্গীর সঙ্গে দিনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার বদলে যদি প্রথমেই ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়, তাহলে সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। দিনের ছোটখাটো ঘটনা নিয়ে কথা বলা, একে অপরের অনুভূতি জানা কিংবা সামান্য হাসি-আড্ডার মধ্য দিয়েই দাম্পত্যের বন্ধন শক্ত হয়। এসব মুহূর্ত কমে গেলে মানসিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সঙ্গী কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন, নিজের আনন্দ বা কষ্টের কথা জানাচ্ছেন—আর অন্যজন তখনও ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতি নিয়মিত ঘটতে থাকলে উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। একসময় সামান্য বিরক্তি থেকে শুরু করে সম্পর্কের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষও দেখা দিতে পারে।
দাম্পত্য সম্পর্কে সবসময় কথা বলার প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি বসে নীরবে সময় কাটানোও সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অবসর পেলেই ফোনের নোটিফিকেশন দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করার অভ্যাস থাকলে সেই স্বাভাবিক নীরবতাও হারিয়ে যায়।
একই ঘরে থেকেও তখন দুজন মানুষ দুটি আলাদা ডিজিটাল জগতে ব্যস্ত থাকেন। ফলে পাশাপাশি থাকার আনন্দ ও একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করার ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে কমে যায়।
‘সব সময় ফোন নিয়ে থাকো’ এমন অভিযোগ যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিয়মিত শোনা যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। এখানে সমস্যা শুধু ফোন ব্যবহারের সময় নয়; বরং সঙ্গীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত মনোযোগ না পাওয়ার অনুভূতিই বিরোধের মূল কারণ হতে পারে।
ফলে ফোনটি ধীরে ধীরে দাম্পত্যের নানা অভিযোগ ও হতাশার দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য মানুষের জীবন সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট পাওয়া যায়। কে কোথায় ঘুরতে গেলেন, কী পোস্ট করলেন কিংবা কোন তারকা কী করছেন—এসব তথ্য সহজেই জানা যায়।
কিন্তু একই সময়ে নিজের সঙ্গী কী নিয়ে চিন্তিত, কী নিয়ে আনন্দিত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কী প্রত্যাশা—এসব যদি অজানা থেকে যায়, তাহলে সম্পর্কের জন্য সেটি সতর্কসংকেত।
দাম্পত্যে প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং দুজনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ‘ফোনমুক্ত সময়’ রাখা যেতে পারে। খাবারের সময়, ঘুমানোর আগে কিংবা একসঙ্গে গল্প করার সময় ফোন দূরে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফোনের পর্দার বদলে পাশে থাকা মানুষটির দিকে মনোযোগ দেওয়া। কারণ একটি সম্পর্ক টিকে থাকে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক মনোযোগ ও একসঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তের ওপরই।