২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে রেখে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য আগামী ১০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে সরকার। পরিকল্পনাটি বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত হওয়ার পর এটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে পরিকল্পনাটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন।
এর আগে সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া জানতে চান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে সরকার কী ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনকে শুধু জিডিপির আকার বাড়ানোর বিষয় হিসেবে দেখছে না সরকার। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিন ধাপে অর্থনীতি পুনর্গঠনের কৌশল
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনে তিন ধাপের ‘৩আর’ কৌশল নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন’ বা পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক বছর মেয়াদি এ পর্যায়ে অর্থনীতির অবনতির ধারা ঠেকিয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ ‘রেস্টোরেশন’ বা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। সরকারের প্রথম তিন বছরে রাজস্ব ব্যবস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ, কৃষি, জ্বালানি ও অবকাঠামোর সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃতীয় ধাপ ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসেলারেশন’ বা দ্রুতগতির জন্য পুনর্গঠন। এ পর্যায়ে আগামী পাঁচ বছরে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে বড় লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনার কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে বিনিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়িক অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর পাশাপাশি ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এফডিআই হিট ম্যাপ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
পুঁজিবাজার, করপোরেট বন্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প অর্থায়নের উৎস শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্য
রাজস্ব আয় বাড়াতেও মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশ এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি সহনীয় রাখা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং বিনিয়োগের বিপরীতে সুফল নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশগত বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকেও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে সরকারের রূপান্তর কৌশলের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানো হবে। এরপর কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সম্প্রসারণ, রাজস্ব ও আর্থিক খাতের সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদে উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে ২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হবে।