ম্যারাডোনার ‘সাদা ম্যারাডোনা’ থেকে বিশ্বকাপের শেষ মঞ্চ—মেসির সেই গল্প

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

কখনো কখনো একটি বাঁশির শব্দ শুধু একটি ম্যাচের শেষ ঘোষণা করে না, একটি যুগেরও পর্দা নামিয়ে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে

2026-09-02T15:04:44+00:00
2026-09-02T15:04:44+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খেলা
ম্যারাডোনার ‘সাদা ম্যারাডোনা’ থেকে বিশ্বকাপের শেষ মঞ্চ—মেসির সেই গল্প
ক্রীড়া ডেস্ক
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
কখনো কখনো একটি বাঁশির শব্দ শুধু একটি ম্যাচের শেষ ঘোষণা করে না, একটি যুগেরও পর্দা নামিয়ে দেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে তেমনই একটি মুহূর্তের জন্ম হলো—ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়, লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ-যাত্রার শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেল।

কত গল্পের শুরু দেখেছি, কিন্তু শেষটা দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না। ২০০৬ সালে যে কিশোরকে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবার মাঠে নামতে দেখেছিলাম, দুই দশক পর সেই মেসির শেষ বিশ্বকাপেরও সাক্ষী হলাম। মাঝের এই ২০ বছর শুধু একজন ফুটবলারের উত্থান নয়; এটি ছিল একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখা এবং শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণের গল্প।

কিছু মুহূর্ত শুধু চোখে দেখা যায় না, মনের ভেতরও স্থায়ী হয়ে থাকে। কিছু ম্যাচ ৯০ মিনিটের খেলা পেরিয়ে হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। লিওনেল মেসিকে ঘিরে আমার বিশ্বকাপের স্মৃতিও তেমনই—২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে তার অভিষেক থেকে ২০২৬ সালে শেষ বিশ্বকাপ, দুই প্রান্তেরই সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার।

দুই বিশ্বকাপে মেসির সাতটি ম্যাচ গ্যালারি থেকে দেখেছি, দেখেছি তার তিন গোল। সোমবার জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর পর ফিরে তাকালে মনে হচ্ছে, শুধু একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার নয়, একটি যুগের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছি আমি।

শুরুটা ২০০৬ সালের ১৬ জুন। গেলসেনকির্শেনের ভেল্টিন্স-অ্যারেনায় সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনা তখন ৩-০ গোলে এগিয়ে। ১৮ বছর ৩৫০ দিনের এক তরুণ অপেক্ষা করছিলেন বিশ্বকাপের মঞ্চে নামার জন্য।

৭৫ মিনিটে ম্যাক্সি রদ্রিগেজের বদলি হিসেবে ১৯ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামলেন মেসি। বিশ্বকাপে তার সেই অভিষেকই হয়ে উঠল এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।

মাঠে নেমেই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হার্নান ক্রেসপোর গোলে সহায়তা করেন। এরপর ৮৮ মিনিটে কার্লোস তেভেজের পাস ধরে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের শটে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেন। মাত্র ১৬ মিনিট মাঠে থেকেই এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট—অভিষেকেই যেন ভবিষ্যতের মেসিকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

তবে সেদিনের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য আমার কাছে মেসির গোল নয়। বরং ম্যাচের একপর্যায়ে সাজঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ।

এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিকের সৌজন্যে ঘটনাটি হাত দশেক দূর থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। মেসি এগিয়ে গিয়ে ম্যারাডোনাকে জড়িয়ে ধরলেন। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর ম্যারাডোনা বন্ধুদের সঙ্গে একটি সেভেন সিটারের গাড়িতে করে চলে গেলেন।

রাতেই ঘটনাটি খবরের শিরোনাম হয়। অতিরিক্ত গতির কারণে ম্যারাডোনাকে জরিমানাও গুনতে হয়েছিল। তবে সেই খবর ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মেসি। ম্যারাডোনার একটি মন্তব্য তখন বিশেষভাবে সাড়া ফেলেছিল—‘সাদা ম্যারাডোনা’ খেলেছে, গোল করেছে।

ম্যারাডোনার সেই কথার মধ্যেই যেন ছিল ভবিষ্যদ্বাণী—আর্জেন্টিনা পেয়ে গেছে নতুন এক ফুটবল জাদুকরকে।

এরপর কেটে গেছে ২০ বছর।

২০২৬ সালে ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখার সুযোগ হলো। এটি ছিল তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ডালাসে জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে তাকে হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকে দেখার সুযোগ হয়।

একটু জোরে বলেছিলাম, ‘মেসি, লাভ ফ্রম বাংলাদেশ।’

হয়তো ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি শুনেই তিনি ফিরে তাকিয়েছিলেন। ঠোঁটে ফুটে উঠেছিল মৃদু হাসি। তারপর চলে গেলেন। কয়েক সেকেন্ডের সেই মুহূর্তটিই আমার কাছে মনে হলো—২০ বছরের একটি বৃত্ত যেন পূর্ণ হলো।

২০০৬ সালের সেই কিশোর এসেছিলেন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। ২০২৬ সালে এসে তিনি ফুটবল ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তি। মাঝের দুই দশকে জিতেছেন অলিম্পিক স্বর্ণ, কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপসহ অসংখ্য শিরোপা ও ব্যক্তিগত পুরস্কার। ভেঙেছেন একের পর এক রেকর্ড।

সবচেয়ে বড় অর্জন, ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে ধরেছেন তিনি।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ছবিটি মেসির জন্য আনন্দের ছিল না। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশির পর মেসির বিষণ্ন মুখ যেন হয়ে রইল দীর্ঘ এক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য।

তবে একটি ফাইনালের ফল দিয়ে মেসিকে বিচার করা যায় না। ২০০৬ সালে যে কিশোর মাত্র ১৬ মিনিটে বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন, দুই দশক পর সেই মানুষটি ছয়টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নাম অমর করে বিদায় নিলেন।

একজন সাংবাদিকের জীবনে অসংখ্য ম্যাচ আসে, বহু তারকার সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু একজন কিংবদন্তির বিশ্বকাপ অভিষেক দেখা এবং দুই দশক পর তার শেষ বিশ্বকাপের সাক্ষী হওয়া—এ সৌভাগ্য সত্যিই বিরল।

আমার বিশ্বকাপের স্মৃতিতে মেসি তাই শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি একটি সময়ের নাম, একটি প্রজন্মের আবেগ। আর আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তিনি দুই বিশ্বকাপের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক অসাধারণ সৌভাগ্যের গল্প।

শেষ হলো মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়। কিন্তু ‘সাদা ম্যারাডোনা’র গল্প শেষ হওয়ার নয়—সেটি থেকে যাবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।


Loading...
Loading...

খেলা- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: