বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

সুজন দে

আন্তর্জাতিক

ক্যামেরার ঝলকানি। সামনে বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের নেতা। তারই মধ্যে হঠাৎ একটি দৃশ্য— ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন

2026-09-02T12:23:52+00:00
2026-09-02T12:23:52+00:00
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
 
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিশকেকে পুতিন-শি জিনপিং ও মোদির হাত ধরাধরি
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
সুজন দে
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ক্যামেরার ঝলকানি। সামনে বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের নেতা। তারই মধ্যে হঠাৎ একটি দৃশ্য— ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পরস্পরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে হাসি, শরীরী ভাষায় স্বস্তি। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যই যেন বহন করল আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বড় বার্তা— প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই থাকুক, সংলাপের দরজা এখনো বন্ধ হয়নি। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ২৬তম সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন-এসসিও শীর্ষ সম্মেলনের পারিবারিক ছবি তোলার সময় দেখা যায় এই দৃশ্য। রুশ প্রেসিডেন্টের সরকারি ক্রেমলিন পুলও মুহূর্তটির ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি একই দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আলাদাভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগ করেন। যদিও দৃশ্যটি ছোট, কিন্তু এর কূটনৈতিক তাৎপর্য বড়।  কারণ এই তিন নেতা শুধু তিনটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নন; তারা এমন তিন শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন, যাদের সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক সম্পর্ক এশিয়ার নিরাপত্তা, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

পুতিন-মোদি : পুরোনো আস্থার সম্পর্ক : বিশকেকে মোদি-পুতিন বৈঠকও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে পড়লেও ভারত মস্কোর সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি বারবার যুদ্ধের অবসান ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। বিশকেকেও মোদি শান্তি ও সংলাপের ওপর জোর দিয়েছেন। এ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পারমাণবিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত আস্থাও এর সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা রয়েছে। মস্কো যত বেশি বেইজিংয়ের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে নির্ভরশীল হচ্ছে, নয়াদিল্লির কাছে ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ধরে রাখা। ভারতের হিসাবটি তাই সূক্ষ্ম— রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু রাশিয়া যেন পুরোপুরি চীনের কৌশলগত বলয়ে চলে না যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু ওয়াশিংটনের মিত্র হয়ে যাবে না; চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সংলাপের পথ বন্ধ করা হবে না।

মোদি-শি : একটি হাত মেলানোর পেছনে অনেক প্রশ্ন : বিশকেকের সবচেয়ে নজরকাড়া মুহূর্ত সম্ভবত মোদি ও শি জিনপিংয়ের সংক্ষিপ্ত করমর্দন। দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা গত কিছুদিন ধরেই দৃশ্যমান। ২০২৫ সালে তিয়ানজিনে এসসিও সম্মেলনের সময়ও মোদি ও শির মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল। সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি দুই দেশ সম্পর্ককে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। তবে একটি করমর্দন মানেই সীমান্ত বিরোধের অবসান নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে— ইন্দো-প্যাসিফিক, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। কিন্তু কূটনীতির সৌন্দর্য এখানেই, শত্রুতা ও সংলাপ একই সঙ্গে চলতে পারে।

বন্ধুত্ব, নাকি কৌশলগত বাস্তবতা : তিন নেতার এই সৌহার্দ্যপূর্ণ মুহূর্তকে সরল অর্থে ‘নতুন জোট’ হিসেবে দেখা ভুল হবে। ভারত, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে যেমন সহযোগিতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বার্থের পার্থক্য, কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অবিশ্বাসও। বিশেষ করে ভারত ও চীনের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই সীমান্ত বিরোধ এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় জটিল। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে, আবার চীনের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কও গত এক দশকে অভূতপূর্বভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তবু এই তিন নেতা যখন একই ফ্রেমে দাঁড়ান, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ছবি থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ভূরাজনীতির একটি প্রতীকী ছবি। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এটিই— একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বে রাষ্ট্রগুলো একই সঙ্গে বন্ধু, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং অংশীদার হতে পারে। 

পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়া বহুদিন ধরে একটি ‘বহুমেরু’ বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছে। ভারতও নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে। এসসিও সেই বহুমুখী কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এসসিওর সদস্যসংখ্যা এখন দশে দাঁড়িয়েছে এবং সংগঠনটি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তার পরিধি বাড়িয়েছে। 

দিল্লির দিকে এখন নজর :  বিশকেকের এই দৃশ্যের পর আন্তর্জাতিক কূটনীতির নজর থাকবে দিল্লির দিকেও। আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে মোদি, শি ও পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং ব্রিকসের পরিসরে ভারত-চীন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দিল্লিতে যদি তিন নেতা আবার একই টেবিলে বসেন, তবে সেটি বিশকেকের ছবির চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কারণ তখন প্রশ্ন হবে— তারা কি শুধু বন্ধুত্বের ছবি তুলবেন, নাকি বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানের দিকে এগোবেন?



Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: