আজ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ পথের এক প্রান্তে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে দলটির জন্ম, অন্য প্রান্তে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের অধ্যায়। আর এখন সেই পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি ক্ষমতাসীন অবস্থায়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সাধারণত রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও রাজপথের কর্মসূচি গুরুত্ব পেত। কিন্তু এবার ক্ষমতাসীন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সেই ধরনের কর্মসূচির বদলে স্মরণ, আলোচনা, দোয়া, সামাজিক ও পরিবেশভিত্তিক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলটি ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলীয় কার্যালয় ও সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করা হবে। আজ সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ৯টায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচি রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারাও এ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। এর পাশাপাশি দেশের জেলা ও মহানগর বিএনপির ইউনিটগুলো নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হবে ৫ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরাও এতে অংশ নেবেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে স্মারক পোস্টার প্রকাশ, বৃক্ষরোপণ এবং মাছ অবমুক্তকরণের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপি কখনো সরকারে, কখনো বিরোধী দলে, আবার দীর্ঘ সময় রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে থেকেছে। চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে দলটি। নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা ২১২টি আসন পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশের মতো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জিয়ার হাত ধরে বিএনপির জন্ম : ১৯৭৮ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির জন্ম। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পেশার মানুষকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে দলটি গড়ে ওঠে। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাসে দলটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণাকে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। আর আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে সামনে চলে আসেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ : বিএনপির ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অধ্যায় আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করে তিনি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া রাজপথের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ দুই নির্বাচনী অধ্যায়েও বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয়ের পর আবার সরকার গঠন করেন তিনি। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধাটি বিশেষভাবে যুক্ত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিএনপির জন্য শুরু হয় দীর্ঘ প্রতিকূল সময়। ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক পালাবদল, পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসন এবং একের পর এক রাজনৈতিক মামলা, গ্রেপ্তার ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটির রাজনীতি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। শেষ জীবনে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে চলে গেলেও দলের নেতাকর্মীদের কাছে তার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সংগ্রামের স্মৃতি হয়ে ওঠে বিএনপির অন্যতম বড় আবেগের জায়গা। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান ঘটায়।
তারেক রহমান : নির্বাসন থেকে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে : খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় ছিলেন তারেক রহমান। ২০০৮ সালের পর তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন বিএনপির রাজনীতিতে ব্যাপক আবেগ ও নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে। কিন্তু দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু তাকে গভীর ব্যক্তিগত শোকের মুখোমুখি করে।
এরপর আসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন। বিএনপির নেতৃত্বে তারেক রহমানের প্রচারাভিযান ও নির্বাচনী কৌশল দলটিকে বড় বিজয় এনে দেয়। নির্বাচনে বিএনপি ও মিত্ররা ২১২টি আসন পেয়ে সংসদে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রায় দুই দশক পর বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারে অভিজ্ঞ বিএনপি নেতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদেরও রাখা হয়েছে। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য নিছক একটি দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই শেষে ক্ষমতায় ফিরে আসার পর নতুন সরকারের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
৪৮ বছর পর বিএনপির সামনে নতুন বাস্তবতা : বিএনপির জন্য এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— দলটি এবার রাজপথের বিরোধী দল নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দল। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির সামনে এখন চ্যালেঞ্জও ভিন্ন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প ও রপ্তানি খাতের পুনরুদ্ধার— এসব বিষয়কে সামনে রেখে সরকারকে এগোতে হচ্ছে। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও নতুন সরকারের সামনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মুহূর্তে বিএনপির রাজনীতির সামনে একটি প্রতীকী প্রশ্নও দাঁড়িয়ে গেছে, ৪৮ বছর আগে যে দল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের কথা সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছিল, ক্ষমতায় ফিরে সেই রাজনৈতিক দর্শনকে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ দেবে?