এমপিদের কাছের মানুষ হতে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

সোহাগ রাসিফ

রাজনীতি

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ কিংবা তফসিল ঘোষণা না হলেও ভেতরে ভেতরে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।

2026-08-31T11:10:30+00:00
2026-08-31T11:10:30+00:00
  মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৭ ভাদ্র ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনীতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন
এমপিদের কাছের মানুষ হতে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ
এমপির নির্বাচনী এলাকা থেকে ঢাকার বাসভবন, চলছে নজর কাড়ার লড়াই
সোহাগ রাসিফ
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ এএম 
এআই ছবি, ভোরের ডাক
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ কিংবা তফসিল ঘোষণা না হলেও ভেতরে ভেতরে পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের যে বিধান পূর্বে ছিল, তা বাতিল করে আবার আগের মতো নির্দলীয় বা প্রতীকবিহীন ব্যবস্থার দিকে ফিরে গেছে সরকার। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছে বিএনপি। নির্বাচনে দলীয় আনুকূল্য পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন মরিয়া হয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের (এমপি) পেছনে ছুটছেন। তবে দলীয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমপিদের নিজস্ব বলয় কিংবা ‘মাইম্যান’ সংস্কৃতি। এ নিয়ে বিব্রত ও ক্ষুব্দ তৃণমূলের অসংখ্য কর্মী।

এমপিদের নির্বাচনী এলাকা, বাসভবন কিংবা কার্যালয় এবং সংসদ ভবনে প্রতিদিন জমে উঠছে তৃণমূল নেতাদের ভিড়। পিএস-এপিএসদের মাধ্যমে এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, সালাম বিনিময় ও তাদের নজর কাড়াই এখন স্থানীয় নেতাদের মূল রাজনৈতিক তৎপরতা। স্থানীয় পর্যায়ে এমপিদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বৈতরণী পার হতে চান তারা।

খোজঁ নিয়ে জানা যায়, ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপির একাধিক প্রার্থী রয়েছে। ওখানকার সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহীম। রাজধানীর মতিঝিলের শরীফ ম্যানশনে তার অফিস। ওই প্রার্থীদের প্রায় প্রত্যেকেই নির্বাচনী এলাকায় এমপিকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিমাসেই নিয়ম করে শরীফ ম্যানশনে এসে তাকে দেখা দেন। কয়েকজন প্রার্থী রয়েছেন যাদেরকে হাফিজ ইব্রাহীম মানোনয়ন না দিলে তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন বলেও জানা গেছে। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার হেসাখাল ইউনিয়নের চেয়াম্যান প্রার্থী শিহাব খন্দকার নামে এক প্রার্থী অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি এমপি মোবাশ্বের ভূইয়ার ‘মাইম্যান’ হিসেবে পরিচিত। সবার ধারণা শিহাব খন্দকারকেই চেয়ারম্যান হিসেবে শতভাগ সমর্থন দেবেন এমপি। তবে এখানে সাবেক এমপি গফুর ভূইয়ারও রয়েছে শক্ত বলয় ও আলাদা কোরাম। শিহাব খন্দকারকে প্রার্থী করা হলে এই গ্রুপের কেউ ছাড় দেবে না বলেও জানিয়েছে ওখানকার নেতাকর্মীরা। দেশের অধিকাংশ আসনেই বর্তমান ও সাবেক এমপিদের অনুসারীদের মধ্যে এমন তীব্র দ্বৈরথ তৈরি হচ্ছে, যা দিনশেষে দলীয় ঐক্য নষ্ট করার শঙ্কা বাড়াচ্ছে। 

বিদ্রোহী ঠেকানোই বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ: নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে, চলতি বছরের শেষদিকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের ভোটগ্রহণ শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে সাড়ে চার হাজার ইউপি, ৩৩০টি পৌরসভা, ৫০০টি উপজেলা ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীন জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে।

যেহেতু এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি দলীয় প্রতীক থাকছে না, তাই একাধিক প্রার্থী বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর ছড়াছড়ি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দলীয় হাইকমান্ড নিশ্চিত যে, অনৈক্য থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা হাতছাড়া হতে পারে। তাই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা এবং বিদ্রোহ ঠেকাতে কড়া অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি এলাকায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই তিনি রাজধানীর গুলশানে বিভিন্ন বিভাগের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে একক প্রার্থীর বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। দলের হাইকমান্ড স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রার্থী বাছাইয়ে তিন মানদণ্ড: অযাচিত প্রভাব ও এমপিদের বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতি রুখতে এবার প্রার্থী নির্বাচনে মূলত তিনটি মানদণ্ড স্থির করেছে বিএনপি। ১. জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা: এলাকা ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রার্থীর কেমন সুনাম রয়েছে। ২. দলের প্রতি ত্যাগ ও আনুগত্য: বিগত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, জেল-জুলুম সহ্য করার রেকর্ড এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সততা। ৩. বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা: রাজনৈতিক ও স্থানীয় সমীক্ষায় জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা।

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, তৃণমূলের ইউনিটগুলো বসে জেলা ও উপজেলার নেতাদের সহায়তায় একক প্রার্থী ঠিক করবে। এমপিদের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও, এমপিদের ইচ্ছেমতো ‘মাইম্যান’ চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত এবং চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম নিশ্চিত করেছেন ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। এমপিরা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বা স্বজনপ্রীতি করলে কেন্দ্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই স্থানীয় সরকার পর্যায়েও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোকে কিছু স্থানে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপির একাধিক সুত্র।

এবার স্থানীয় নির্বাচনে প্রশাসনিক বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান জানিয়েছেন, কে জিতল আর কে হারল তা সরকারের দেখার বিষয় নয়। নির্বাচন শতভাগ গ্রহণযোগ্য ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখাটাই সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ। ৯ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে, প্রশাসনিক বা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জেতার দিন শেষ। নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, নির্বাচনী আমেজ বাড়ার পাশাপাশি এমপিদের বলয় ভেঙে যোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য প্রার্থী খুঁজে বের করা এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ‘মাইম্যান’দের দৌড়ঝাপ সামলে বিএনপি তৃণমূলের শৃঙ্খলা কতটা বজায় রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



Loading...
Loading...

রাজনীতি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: