বয়স ৫০ ছুঁইছুঁই। মাথার চুলে পাক ধরেছে, জীবনের কঠিন বাস্তবতাও দেখেছেন অনেক। কিন্তু ফুটবলের মাঠে এখনো তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন ক্রেগ কার্বি। শুধু তাই নয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করে এবার ইংল্যান্ডের ওভার-ফিফটি জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন এই সাবেক সেনাসদস্য।
রচডেল শহরের উত্তরে মেথডিস্ট চার্চের ওপর নিজের জিম চালু করার সময়ও কার্বির ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন আসছিল। স্থানীয় পার্কে খেলা একটি অপেশাদার ম্যাচের ভিডিও টিকটকে পোস্ট করেছিলেন তিনি। মুহূর্তেই সেটি ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায়। ভিডিওটির ভিউ ছাড়িয়ে যায় ৮৫ হাজার।
তবে কার্বির ভিডিও ভাইরাল হওয়া নতুন কিছু নয়। তাঁর ‘ফুটবল এট ফিফটি’ পেজের জনপ্রিয়তা এখন বেশ বড়। টিকটকে পিন করে রাখা একটি ভিডিও এরই মধ্যে দেখা হয়েছে প্রায় ২৯ লাখ বার। সেখানে ৫০ বছর বয়সী কার্বির পায়ের কারুকাজ দেখে অনেকেই বিস্মিত।
ভিডিওগুলোতে কখনো গ্রামের মাঠ, কখনো স্থানীয় পার্ক—সেখানেই তরুণদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে দেখা যায় তাঁকে। সুঠাম ফিটনেস, নিখুঁত পাস আর বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতায় বয়স যেন তাঁর কাছে কেবলই একটি সংখ্যা।
কিন্তু এই ফুটবলযাত্রার পেছনে রয়েছে গভীর বেদনার গল্প।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মাত্র ২০ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন কার্বির ছেলে সেবাস্টিয়ান। সে সময় রয়্যাল এয়ার ফোর্সে কর্মরত ছিলেন তিনি। একমাত্র সন্তানের এমন করুণ মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন কার্বি। ফুটবলও ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
পরে স্ত্রী লিন্ডসে তাঁকে আবার মাঠে ফেরার অনুপ্রেরণা দেন। তাঁর স্ত্রীই কার্বির ফুটবল খেলার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করার পরামর্শ দেন।
কার্বি ভেবেছিলেন, হয়তো কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবই ভিডিওগুলো দেখবেন। কিন্তু একপর্যায়ে ভিডিওর ভিউ লাখ ছাড়িয়ে মিলিয়নে পৌঁছায়। এরপর ‘ফুটবল এট ফিফটি’ হয়ে ওঠে তাঁর নতুন পরিচয়।
কার্বি বলেন, ‘এখন ২০ বা ৩০ বছর বয়সের চেয়েও আমি ফুটবলটা বেশি উপভোগ করছি।’
ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অবশ্য অনেক পুরোনো। কৈশোরে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সে ট্রায়ালও দিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার মতো সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্নে ফুটবলের সেই পথ থেমে যায়।
২৫ বছর বয়সে সেনাবাহিনী ছাড়ার পর কেমব্রিজ ইউনাইটেড থেকেও প্রস্তাব পেয়েছিলেন কার্বি। তবে পরিবারের দায়িত্বের কথা মাথায় রেখে পেশাদার ফুটবলের বদলে পার্সোনাল ট্রেইনার হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
এখন সেই কার্বিই ৫০ বছর বয়সে মাঠে তরুণ প্রতিপক্ষদের বিপাকে ফেলছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা তাঁর খেলার সঙ্গে তুলনা করছেন জিনেদিন জিদান কিংবা সের্হিও বুসকেতসের মতো তারকাদের।
আর এবার এসেছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি—ইংল্যান্ডের ওভার-ফিফটি জাতীয় দলে ডাক।
থাইল্যান্ডে থ্রি লায়ন্সদের জার্সিতে নিজের প্রথম অফিশিয়াল ম্যাচ খেলার অপেক্ষায় আছেন কার্বি। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেরিয়ে ফুটবলই যেন তাঁকে আবার বাঁচার নতুন কারণ দিয়েছে।
কার্বির কাছে অবশ্য প্রতিটি ম্যাচের অর্থ আরও গভীর।
তিনি বলেন, ‘আমি শোকের কারণে প্রিয় খেলাটা ছেড়ে দিতে চাইনি। ৯৯ শতাংশ সময় আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। তবে আমি যখনই মাঠে নামি, পুরো খেলাটাই আমার ছেলে “সেব”-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা থাকে।’
কার্বির গল্প এখন শুধু ফুটবলের নয়; এটি শোককে শক্তিতে রূপ দেওয়ার গল্প। বয়সের অজুহাতে যারা স্বপ্ন থেকে দূরে সরে যান, তাঁদের জন্যও তিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণা।
তাঁর পরামর্শ, ‘কোনো কিছু করতে চাইলে দ্বিধা না করে মাঠে নেমে পড়ুন। চিন্তা করাই মূল বাধা, কাজটা করে ফেলা নয়।’
কবে ফুটবলকে বিদায় জানাবেন—এমন প্রশ্নের জবাবেও রসিকতা করতে ভোলেননি ৫০ বছরের এই তরুণ।
হেসে কার্বি বলেন, ‘যেদিন মাঠে কোনো তরুণ আমাকে ড্রিবল করে পার হয়ে গিয়ে হাসাহাসি করবে, বুঝব থামার সময় এসেছে!’