জেনারেটরে চলছে কারখানা, ডিজেলে টান

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। অথচ গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুৎও আসছে-যাচ্ছে। তাই বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালু রাখতে হচ্ছে। আর

2026-08-29T13:05:41+00:00
2026-08-29T13:05:41+00:00
  রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
 
রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
পাম্পে কমছে মজুত
জেনারেটরে চলছে কারখানা, ডিজেলে টান
গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি সামলাতে বাড়ছে তেলের ওপর নির্ভরতা
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১:০৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। অথচ গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুৎও আসছে-যাচ্ছে। তাই বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালু রাখতে হচ্ছে। আর জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে বাড়ছে ডিজেলের ব্যবহার। শিল্পাঞ্চলের একাধিক কারখানায় এখন এমন চিত্র। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে ডিজেলের সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।

শিল্পকারখানায় ডিজেলের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোতেও মজুত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার মতো শিল্পঘন এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ডিজেলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় রেশনিং করে বিক্রি করতে হচ্ছে বলে পাম্প মালিকদের সংগঠন জানিয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে চাহিদা অনুযায়ী সারা দেশে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় ডিজেলের চাহিদা অস্বাভাবিক বেড়েছে।

সংগঠনটির দাবি, ঢাকা বিভাগে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১০ থেকে ১২ গুণ বেড়েছে। গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় পরিস্থিতি আরও তীব্র। আগে কোনো কোনো পাম্পে দৈনিক ৪ থেকে ৫ হাজার লিটার ডিজেল বিক্রি হলেও এখন তা প্রায় ২০ হাজার লিটারে উঠেছে। ফলে শিল্পাঞ্চলের কিছু পাম্পে জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং করতে হচ্ছে। তৈরি হয়েছে ‘প্যানিক’ কেনাকাটার প্রবণতাও।

গ্যাসের বিকল্প ডিজেল : দেশের শিল্পকারখানার বড় অংশের প্রধান জ্বালানি গ্যাস। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুরের একটি স্পিনিং কারখানায় স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন হতো। গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশে। উৎপাদনের যে অংশ চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে, সেখানে গ্রিডের বিদ্যুতের পাশাপাশি ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে।

বস্ত্রশিল্পের বাইরে ওষুধ, ইস্পাত, খাদ্য, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন শিল্পেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোথাও উৎপাদনসূচি বদলানো হচ্ছে, কোথাও যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চলে গেলে যাতে পুরো উৎপাদন বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য জেনারেটর প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

ইস্পাত খাতের পরিস্থিতি এর একটি বড় উদাহরণ। গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের কারণে বিএসআরএমের মতো প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির তেল ব্যবহারের পরিমাণ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
 
নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো শিল্পঘন এলাকায় গ্যাসনির্ভর অনেক কারখানা কম সক্ষমতায় চলছে। কোথাও কারখানা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবে এতে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

একই ডিজেলের ওপর দুই চাপ : ডিজেলের চাহিদা বাড়ার পেছনে শুধু শিল্পকারখানা নয়, বিদ্যুৎ সংকটও বড় কারণ। চলতি আগস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হয়েছে। কোনো কোনো সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গত ৩ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি জ্বালানি সংকটে ছিল। এর মধ্যে ৩৩টি ছিল তরল জ্বালানিনির্ভর। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র চালানোর প্রয়োজন পড়েছে।

গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি বন্ধ থাকা ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। অর্থাৎ একই সময়ে ডিজেলের ওপর তৈরি হচ্ছে দুই ধরনের চাপ। বিদ্যুৎ ঘাটতি সামলাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ডিজেল বা অন্যান্য তরল জ্বালানির প্রয়োজন হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ না থাকায় শিল্পকারখানাও জেনারেটর চালাতে ডিজেল কিনছে। এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহন ও কৃষি খাতের স্বাভাবিক চাহিদা।

পাম্পে কমছে মজুত : শিল্পকারখানার বাড়তি চাহিদার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে ডিজেল সরবরাহ সীমিত হওয়া, দীর্ঘ লাইন এবং ডিপো থেকে বরাদ্দ কমে যাওয়ার খবর এসেছে। শিল্পাঞ্চলের পাম্পগুলোতে চাপ সবচেয়ে বেশি।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিএসআরএমের দৈনিক প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় প্রতিষ্ঠানটি কম জ্বালানি পেয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও দৈনিক প্রয়োজনের প্রায় ৬০ শতাংশ ডিজেল ডিপো থেকে পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এতে তাদের কিছু কারখানার উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার তথ্য এসেছে। এখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, শিল্পকারখানার উৎপাদন চালু রাখতে ডিজেলের সরবরাহ বাড়ানো হলে পরিবহন, কৃষি ও খুচরা বাজারে এর প্রভাব কতটা পড়বে?

পাম্প মালিকদের সংগঠনের চিঠিতে বলা হয়েছে, বিপণন কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের সীমা বেঁধে দেওয়ায় অনেক পাম্প প্রয়োজন অনুযায়ী মজুত করতে পারছে না। ফলে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ একই হারে না বাড়ায় কিছু এলাকায় সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় : ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে কারখানা সচল রাখা সম্ভব হলেও এর খরচ গ্যাস বা গ্রিড বিদ্যুতের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ, একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘ সময় এভাবে চললে এর প্রভাব শুধু কারখানার ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে সেই চাপ ছড়িয়ে পড়বে বাজারেও। ওষুধশিল্পেও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সংকট দীর্ঘ হলে ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতির এই চক্রে একটি সংকট আরেকটি সংকটকে বড় করছে। গ্যাসের ঘাটতিতে জেনারেটর চলছে, জেনারেটর চালাতে ডিজেল লাগছে। ডিজেলের চাহিদা বাড়ায় পাম্প ও ডিপোতে চাপ বাড়ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, আর সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন চ্যালেঞ্জ : চলতি বছরের শুরুতেও আন্তর্জাতিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। পরে বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। মার্চে চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ডিজেল আসার তথ্যও প্রকাশিত হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি শুধু দেশে পর্যাপ্ত ডিজেল আছে কি না, তা নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চাহিদা অনুযায়ী কোন খাতে কতটা সরবরাহ করা হচ্ছে এবং শিল্প, পরিবহন, কৃষি ও খুচরা বাজারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে।

গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। তাতে ডিজেলের চাহিদাও বাড়বে। আর সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ তাল মেলাতে না পারলে পাম্পের মজুত কমে গিয়ে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।   শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখতে আপাতত ডিজেল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ডিজেল দিয়ে গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এতে উৎপাদন টিকলেও খরচ বাড়ে, আর সেই খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ে ভোক্তার ওপর। তাই শিল্প বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল সংকট সমাধান করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সংকট সামাল দিতে গিয়ে যেন আরেকটি জ্বালানি সংকট তৈরি না হয়, সেদিকেই নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: