চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকায় সবুজের চাদরে মোড়ানো ঐতিহ্যবাহী বেলগাঁও চা বাগান। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, সারি সারি চা গাছ আর নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে বাগানটি সহজেই আকৃষ্ট করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। তবে সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে শত বছরের শ্রম, সম্ভাবনা ও নানা সংকটের গল্প।
১৯১২ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই চা বাগান দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চা শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রতিদিন শত শত শ্রমিক বাগানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের শ্রমেই পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নতমানের চা পাতার কারণে বেলগাঁও চা বাগানে উৎপাদনের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি ২০২৬ সালে বাগানটি প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি সংকট
উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও নানা সমস্যায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বাগানের কার্যক্রম। তীব্র লোডশেডিং, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে চা প্রক্রিয়াজাতকরণে সমস্যা হচ্ছে।
এ ছাড়া চা পাতার ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং শীত ও শুষ্ক মৌসুমে কৃত্রিম সেচের প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
পর্যটনের হাতছানি
বেলগাঁও চা বাগানকে ঘিরে রয়েছে বড় ধরনের পর্যটন সম্ভাবনাও। পাহাড়ি প্রকৃতি, চা-বাগানের সবুজ পরিবেশ এবং নিরিবিলি আবহ পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এলাকার শিক্ষাবিদ জয়নুল কবির বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বেলগাঁও চা বাগানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তার মতে, উন্নত সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত গণপরিবহন চালু করা গেলে বাঁশখালীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ হবে। এতে সময় ও খরচ দুটিই কমবে।
আনোয়ারা, সাতকানিয়া, পটিয়া ও কক্সবাজার থেকে আসা কয়েকজন পর্যটকও বেলগাঁও চা বাগানকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা তৈরি করা হলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে।
বাড়তে পারে রাজস্ব, তৈরি হবে কর্মসংস্থান
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা, আধুনিক শৌচাগার, বিশ্রামাগার, পার্কিং সুবিধা এবং স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের দোকান গড়ে তোলা গেলে বেলগাঁও চা বাগানকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।
প্রবেশ ফি ও পার্কিং চার্জের মতো ব্যবস্থা চালু করা গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়তে পারে। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বেলগাঁও চা বাগানের শ্রমিক নুর হোসেন বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে তাদের পরিবার ও পূর্বপুরুষেরা এই বাগানে কাজ করে আসছেন।
তিনি বলেন, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমরা চা পাতা তুলি। কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের ন্যায্য মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বাড়েনি। বর্তমানে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবন চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাগান বাঁচলে এবং আমাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে শ্রমিকদের কষ্ট কিছুটা কমবে।
চট্টগ্রাম চা বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী (পিডিইউ) আবু হেনা মো. ময়নুল ইসলাম ভোরের ডাক-কে বলেন, বেলগাঁও চা বাগান দেশের চা শিল্প ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, বেলগাঁওয়ের পর্যটন সম্ভাবনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ঐতিহ্যবাহী বেলগাঁও চা বাগান এলাকার অর্থনীতি ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বাগানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সার্বিক সুরক্ষায় প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, চা বাগানের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চা শিল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটনের বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
শত বছরের ঐতিহ্য, শ্রমিকের ঘাম আর পাহাড়ি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে বেলগাঁও চা বাগান এখন শুধু একটি চা উৎপাদনকেন্দ্র নয়; পরিকল্পিত উদ্যোগ ও বিনিয়োগ পেলে এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।