
রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে এসেছে, সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিনেই আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, জান্নাতে প্রবেশ এবং পৃথিবীতে আগমন ঘটেছে। কিয়ামতও সংঘটিত হবে এই দিনে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)
জুমার এই বিশেষ মর্যাদার কারণে দিনটিকে অবহেলায় না কাটিয়ে ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন আলেমরা। জুমার দিনে যেসব আমল করা যেতে পারে, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো-
জুমার প্রস্তুতির অন্যতম অংশ হলো গোসল করা, শরীর ও পোশাক পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সম্ভব হলে সুগন্ধি ব্যবহার করা। মসজিদে যাওয়ার আগে নিজেকে পরিপাটি করে নেওয়ার প্রতি হাদিসে বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের গোসল ও মসজিদে দ্রুত যাওয়ার বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে গোসল করে দ্রুত মসজিদে যায়, ইমামের কাছাকাছি বসে এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছরের নফল রোজা ও নামাজের সওয়াবের কথা হাদিসে এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)
জুমার দিন মসজিদে দেরিতে না গিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী আগে পৌঁছানো উত্তম। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বিভিন্ন সময়ে মসজিদে প্রবেশকারীদের জন্য বিভিন্ন মাত্রার সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হাদিসে প্রথম দিকে মসজিদে পৌঁছানো ব্যক্তির সওয়াবকে উট কোরবানির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এরপর যারা আসে, তাদের জন্য যথাক্রমে গরু, ছাগল, মুরগি ও ডিম সদকার অনুরূপ সওয়াবের কথা এসেছে। ইমাম খুতবার জন্য বসলে ফেরেশতারা আগত মুসল্লিদের নাম লেখা বন্ধ করে খুতবা শুনতে থাকেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৪১)
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত অবশ্যই জুমার নামাজ। কোরআনে আল্লাহ তাআলা জুমার নামাজের আহ্বান শোনার পর ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দুনিয়াবি কাজ ছেড়ে আল্লাহর স্মরণের দিকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এক আয়াতে বলা হয়েছে, জুমার নামাজের জন্য আহ্বান করা হলে মুমিনদের আল্লাহর স্মরণের দিকে ছুটে যেতে এবং বেচাকেনা ছেড়ে দিতে হবে।
এ নির্দেশের মধ্যে জুমার নামাজের গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি দুনিয়াবি ব্যস্ততার ওপর ইবাদতকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষাও রয়েছে।
অনেক সময় খুতবা চলাকালে মুসল্লিদের মধ্যে কথা বলা, মোবাইল দেখা কিংবা পাশের ব্যক্তির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যায়। অথচ হাদিসে খুতবার সময় নীরব থাকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় কেউ যদি তার পাশের ব্যক্তিকে ‘চুপ থাকো’ বলেও, তবে সে অনর্থক কাজে লিপ্ত হলো। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৪০১)
তাই খুতবার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ ইমামের বক্তব্যের দিকে রাখা উচিত।
জুমার দিনের সঙ্গে সুরা কাহাফ পাঠের আমলটি বিশেষভাবে পরিচিত। হাদিসে এ সুরা পাঠের কারণে দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে নূর লাভের কথা বর্ণিত হয়েছে।
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনে সুরা কাহাফ পাঠের ফজিলত উল্লেখ করেছেন। (আল-মুসতাদরাক, ২/৩৯৯)
তাই সময় করে জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা যেতে পারে। তিলাওয়াতের পাশাপাশি সুরাটির অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করলে আমলটি আরও অর্থবহ হতে পারে।
জুমার দিনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক আমলগুলোর একটি হলো দোয়া। হাদিসে এমন একটি বিশেষ সময়ের কথা এসেছে, যখন কোনো মুসলিম কল্যাণকর কিছু চাইলে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন। হাদিসে সেই সময়টি আসরের পর খুঁজে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)
তাই আসরের পরের সময়টুকু অবহেলায় না কাটিয়ে তওবা, ইস্তিগফার ও নিজের প্রয়োজনের জন্য দোয়া করা যেতে পারে।
জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে তাঁর ওপর বেশি পরিমাণে দরুদ পাঠ করতে। কারণ এ দিনে উম্মতের পাঠানো দরুদ তাঁর কাছে পেশ করা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭)
তাই জুমার দিনকে দরুদ পাঠের একটি বিশেষ সুযোগ হিসেবেও নেওয়া যেতে পারে।
জুমার দিনের বিশেষত্ব দিনের শুরু থেকেই রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) শুক্রবারের ফজরের নামাজে সুরা আস-সিজদা ও সুরা আল-ইনসান পাঠ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৬৮)
এটি জুমার দিনের একটি সুন্নত আমল। তবে এ সুন্নত পালন করা সবার জন্য আবশ্যক নয়; যারা ইমাম, তারা এটি অনুসরণ করতে পারেন।
জুমার দিনের সবচেয়ে বড় আশার জায়গাগুলোর একটি হলো- সঠিক নিয়মে জুমার প্রস্তুতি নেওয়া, নামাজ আদায় করা এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফের সুসংবাদ।
সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, জুমার দিন গোসল করে পবিত্রতা অর্জন, সুগন্ধি ব্যবহার, মসজিদে গিয়ে কাউকে কষ্ট না দিয়ে নামাজ আদায় এবং ইমামের খুতবার সময় নীরব থাকার মাধ্যমে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী গুনাহ মাফ করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
তবে হাদিসে কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্তও এসেছে। তাই জুমার ফজিলতকে গুনাহের প্রতি উদাসীন হওয়ার সুযোগ হিসেবে না দেখে আত্মশুদ্ধির প্রেরণা হিসেবে নেওয়া উচিত।
জুমার মাহাত্ম্য আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদতময় দিনের ধারণা সামনে আনে। পরিচ্ছন্নতা দিয়ে শুরু, সময়মতো মসজিদে যাওয়া, জুমার নামাজ আদায়, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সুরা কাহাফ পাঠ, দরুদ ও জিকির, তওবা-ইস্তিগফার এবং দোয়া- সব মিলিয়ে একজন মুমিনের জন্য এটি আত্মিকভাবে নিজেকে নতুন করে গড়ার সুযোগ।
সপ্তাহের ব্যস্ততার মাঝে জুমার দিন তাই হতে পারে থেমে দাঁড়ানোর একটি উপলক্ষ। নিজের কাজের হিসাব নেওয়া, ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা- এই হোক জুমার দিনের মূল শিক্ষা।