শুধু ‘কবুল’ নয়, এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেও বিয়ে সম্পন্ন হবে

অনলাইন ডেস্ক

ধর্ম

বিয়ের সময় শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ইসলামী শরিয়তে মূল বিষয় হলো বর-কনের

2026-08-01T16:00:06+00:00
2026-08-01T16:00:06+00:00
  রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
ধর্ম
শুধু ‘কবুল’ নয়, এই শব্দগুলো উচ্চারণ করলেও বিয়ে সম্পন্ন হবে
অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০০ পিএম 
প্রতীকী ছবি
বিয়ের সময় শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। ইসলামী শরিয়তে মূল বিষয় হলো বর-কনের স্পষ্ট সম্মতি (ইজাব-কবুল)। তাই ‘কবুল’ শব্দের পাশাপাশি অর্থে একই ধরনের সম্মতি প্রকাশ করে এমন শব্দ বা বাক্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে তা অবশ্যই শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত—সাক্ষী, অভিভাবক (যেখানে প্রযোজ্য) এবং অন্যান্য বিধান—পূরণ সাপেক্ষে হতে হবে। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি বিয়ে করল, সে তার অর্ধেক ইমান (দ্বীন) পূর্ণ করে ফেলল। অতএব, বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (বায়হাকি, শুআবুল ইমান)

অন্য এক হাদিসে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, ‘হে যুবকরা! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিয়ের দায়িত্ব পালনে সক্ষম, সে যেন বিয়ে করে। কারণ, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার জন্য ‘ইজাব’ (প্রস্তাব) এবং ‘কবুল’ (গ্রহণ) অপরিহার্য। তবে শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করলেই নিকাহ হবে—বিষয়টি এমন নয়। প্রস্তাব গ্রহণের অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এমন আরও কিছু শব্দ ও বাক্যের মাধ্যমেও নিকাহ শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হতে পারে।

বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার মৌলিক শর্ত

বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়। সেগুলো হলো—

⇛ প্রথমত, ‘ইজাব’ বা এক পক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব থাকতে হবে।

⇛ দ্বিতীয়ত, অপর পক্ষের ‘কবুল’ বা সম্মতিসূচক জবাব থাকতে হবে।

⇛ তৃতীয়ত, এমন স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যাতে নিকাহের অর্থ সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

⇛ চতুর্থত, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতি থাকতে হবে।

‘কবুল’ না বলেও যেসব শব্দে নিকাহ সম্পন্ন হয়

১. قَبِلْتُ (ক্ববিলতু)

অর্থ: ‘আমি গ্রহণ করলাম।’ ইজাবের জবাবে বর বা কনে যদি ‘قَبِلْتُ’ বলে, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ কবুল হিসেবে গণ্য হবে।

২. رَضِيتُ (রদ্বিতু)

অর্থ: ‘আমি রাজি হলাম’ বা ‘আমি সন্তুষ্ট হলাম।’ ইজাবের পর এই শব্দ ব্যবহার করলেও তা সম্মতির প্রকাশ হিসেবে গণ্য হবে এবং নিকাহ শুদ্ধ হবে।

৩. تَزَوَّجْتُهَا (তাজাওয়াজ্জাতুহা)

অর্থ: ‘আমি তাকে বিবাহ করলাম।’ বর যদি এভাবে নিজের সম্মতি প্রকাশ করেন, তাহলে সেটিও নিকাহের সুস্পষ্ট গ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

৪. أَنْكَحْتُ نَفْسِي إِيَّاهُ (আনকাহতু নাফসি ইয়্যাহু)

অর্থ: ‘আমি নিজেকে তার সঙ্গে বিবাহ করলাম।’ এই বাক্যও নিকাহ গ্রহণের স্পষ্ট অর্থ বহন করে।

৫. أَجَزْتُهُ (আজাযতুহু)

অর্থ: ‘আমি এটি অনুমোদন করলাম।’ প্রতিনিধি বা ওকিলের মাধ্যমে ইজাব সম্পন্ন হওয়ার পর মূল ব্যক্তি যদি এভাবে অনুমোদন দেন, তাহলে নিকাহ সহিহ হবে।

ফিকহি গ্রন্থের দলিল

১. الفتاوى الهندية (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)

ويجوز النكاح بألفاظ هي صريحة في النكاح، كأنكحت، وتزوجت، وقبلت، ورضيت، ونحوها

বাংলা অর্থ: নিকাহ এমন সব স্পষ্ট শব্দের মাধ্যমে জায়েয হয়, যেমন أنكحتُ، تزوجتُ، قبلتُ، رضيتُ ইত্যাদি।

২. الهداية (আল-হেদায়া)

ويعتبر الإيجاب والقبول بلفظ يدل عليه صريحاً

অর্থ: ইজাব ও কবুল এমন শব্দে হতে হবে, যা দ্বারা স্পষ্টভাবে নিকাহের অর্থ প্রকাশ পায়।

৩. الدر المختار مع رد المحتار (আদ-দুররুল মুখতার মাআ রদ্দুল মুহতার/ফতোয়ায়ে শামী)

ويصح النكاح بكل لفظ صريح يدل على التمليك في الحال، كزوجتك، أنكحتك، وتزوجت ونحوها

অর্থ: বর্তমান অবস্থায় মালিকানা (বৈবাহিক সম্পর্ক) প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে—এমন প্রত্যেকটি স্পষ্ট শব্দ দ্বারা নিকাহ সহিহ হয়। যেমন زوجتك، أنكحتك، تزوجت এবং এ ধরনের অন্যান্য শব্দ।

কোরআনের দৃষ্টান্ত
فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ

অর্থ: ‘অতঃপর হয় ভদ্রভাবে স্ত্রীকে রেখে দাও, অথবা সম্মানের সঙ্গে তাকে বিদায় দাও।’ (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)

এখানে إِمْسَاكٌ শব্দের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার সম্মতি ও স্বীকৃতির বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে, যা কবুলের মূল তাৎপর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

হাদিসের দলিল
النكاح عن تراض

অর্থ: ‘নিকাহ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।’ (সুনান ইবনু মাজাহ)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করাই একমাত্র শর্ত নয়; বরং পারস্পরিক সম্মতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেলেই নিকাহ সম্পন্ন হতে পারে।

উপসংহার

ফিকহে হানাফির দৃষ্টিতে, নিকাহের সময় শুধু ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ করাই বাধ্যতামূলক নয়। বরং এমন যেকোনো স্পষ্ট শব্দ বা বাক্য, যা দ্ব্যর্থহীনভাবে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ ও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সম্মতি প্রকাশ করে, তা ব্যবহার করলেও নিকাহ সহিহ হবে। তবে এর জন্য শরিয়ত নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত—বিশেষ করে সাক্ষীর উপস্থিতি, ইজাব-কবুলের একই মজলিসে সম্পন্ন হওয়া এবং বক্তব্যের সুস্পষ্টতা—অবশ্যই পূরণ হতে হবে।

তবে বিকল্প শব্দ ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ ফকিহ ভবিষ্যতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি, বিতর্ক বা আইনি জটিলতা এড়াতে প্রচলিত পদ্ধতিতেই ‘আমি কবুল করলাম’ বা অনুরূপ সুপরিচিত শব্দ ব্যবহার করে নিকাহ সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে নিকাহের বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট থাকে এবং ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কাও কমে যায়।


Loading...
Loading...

ধর্ম- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: