পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরা, ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটি মুসলমানদের জন্য ত্যাগ, সত্য, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা বহন করে। আশুরা উপলক্ষে নফল রোজা পালন, বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি, তওবা-ইস্তিগফার, দোয়া এবং মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই আশুরার প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করে আত্মশুদ্ধি ও নেক আমলের মাধ্যমে দিনটি পালন করাই একজন মুসলমানের করণীয়।
সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সময় ও কালকে আবর্তিত করেন এবং দিন, বছর ও মাসকে নবায়ন করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি জিন ও মানবজাতি সৃষ্টি করেছেন এবং এক মানুষকে অন্য মানুষের ওপর, এক সময়কে অন্য সময়ের ওপর এবং এক স্থানকে অন্য স্থানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নেতা, আমাদের নবী ও অভিভাবক মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল; যিনি আশুরার দিনের ফজিলত বর্ণনা করেছেন এবং এই দিনে রোজা রেখেছেন ও রোজা রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহর চিরন্তন রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর ওপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিগণের ওপর।
আজ মহিমান্বিত আশুরার দিন। এই দিনের কিছু উত্তম বা করণীয় কাজ রয়েছে এবং কিছু গর্হিত বা বর্জনীয় কাজও রয়েছে।
করণীয় বা উত্তম কাজগুলোর অন্যতম হলো, এই দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। আর সবচেয়ে উত্তম হলো দুই দিন রোজা রাখা; আশুরার দিন এবং তার আগের একদিন অথবা পরের একদিন। নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)। নবী করীম (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা এই দিনে ইহুদিদের বিপরীত করো; আশুরার আগের একদিন অথবা পরের একদিনসহ রোজা রাখো। (মুসনাদে আহমদ)
এই দিনের আরেকটি উত্তম আমল বা করণীয় হলো, পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের জন্য ভালো খাবার-পানীয়ের সুব্যবস্থা করা। নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার পরিবার-পরিজনের প্রতি (খাবার-দাবারে ও অন্যান্য ব্যাপারে) উদারতা প্রদর্শন করবে, আল্লাহ তাআলা সারা বছর তার প্রতি উদারতা (রিজিকের প্রশস্ততা) বজায় রাখবেন।’
এই দিনের বর্জনীয় বা গর্হিত কাজগুলোর অন্যতম হলো—মানুষ এই দিন হজরত হোসাইনের (রা.) স্মরণে মাতম বা শোক পালনের যে প্রথা আবিষ্কার করেছে। জেনে রাখুন, আশুরার দিনের মূল ফজিলত কারবালার প্রান্তরে হজরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের শহীদ হওয়ার ঘটনার কারণে নয়। বরং এর মূল ফজিলত হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুসা (আ.) আল্লাহর এই নেয়ামতের শুকরিয়াস্বরূপ এই দিনে রোজা রাখতেন, তাঁর সঙ্গীগণও রোজা রাখতেন। একইভাবে আমাদের নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিগণও এই ঘটনার স্মরণে রোজা রেখেছেন।
নবীজির (সা.) ইন্তেকালের বেশ কিছু বছর পর এই দিনে নবীজির (সা.) নাতি হজরত হোসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। হজরত হোসাইন (রা.) আল্লাহর দ্বীনের বাণীকে সমুন্নত করার জন্য এবং আল্লাহর জমিনে খেলাফত ও সঠিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য কারবালায় গিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চ অটলতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।
বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান করলে, তা তো তার অন্তরের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।’
আমি আমার নিজের জন্য, আপনাদের জন্য ও সকল মুসলমানের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনারা তাঁর কাছে ক্ষমা চান, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।