রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পরিবহনশ্রমিকেরা। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না শেষ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগছে, আবার কোথাও দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাসই মিলছে না। একই সংকটে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট ও অপেক্ষার সারি।
মিরপুরের আমতলা এলাকায় একটি টিনের ঘরে আটটি পরিবারের বসবাস। তাদের জন্য রয়েছে মাত্র একটি রান্নাঘর ও দুটি গ্যাসের চুলা। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় একটি পরিবারের রান্না শেষ করতেই কয়েক ঘণ্টা সময় লাগছে। ফলে অন্য পরিবারগুলোকে চুলার পাশে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শিরিন বেগম জানান, আগে যে রান্না অল্প সময়ে শেষ হতো, এখন তা করতে অনেক বেশি সময় লাগছে। গ্যাসের চাপ এত কম যে সরাসরি চুলায় ভাত বসানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে পানি গরম করে এরপর চাল দিতে হচ্ছে।
শুধু গৃহিণীরাই নন, কর্মজীবী নারীদের ভোগান্তি আরও বেশি। অনেককে ভোরে উঠে রান্না শেষ করে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় অনেক সময় রান্না অসম্পূর্ণ রেখেই বের হতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকটের কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করতে দেখা গেছে। কোথাও বাড়ির ছাদে কাঠের চুলা তৈরি করে রান্না করছেন ভাড়াটিয়ারা। এতে অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি ধোঁয়া ও পরিবেশদূষণের সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। কম চাপের কারণে একটি গাড়িতে গ্যাস দিতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে স্টেশনের সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
মিরপুরের একটি সিএনজি স্টেশনের কর্মী জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। চাপ কম থাকায় দুটি ডিসপেনসারি একসঙ্গে চালানোও সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না।
ব্যক্তিগত গাড়ির চালক খোরশেদ আলম জানান, প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাঁর গাড়িতে মাত্র ১৭৮ টাকার গ্যাস দেওয়া হয়েছে। কম চাপের কারণে সেই গ্যাসে গাড়ি স্বাভাবিক দূরত্বও চলবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে তাঁর।
যাত্রীবাহী বাসের চালক মামুন মিয়াও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর বাসে সাধারণত ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকার গ্যাস নেওয়া সম্ভব হলেও এদিন পেয়েছেন মাত্র ২৬০ টাকার মতো। তাঁর ভাষায়, এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে কয়েকটি ট্রিপ চালানোও কঠিন।
গ্যাসের চাপ না থাকায় মিরপুরের কয়েকটি সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। কোনো কোনো স্টেশনে রাতের কয়েক ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ হলেও দিনের বেলায় পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছু স্টেশনে গ্যাসের আশায় দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে। একটি স্টেশনে ৩৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ৪৩টি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে অপেক্ষমাণ অবস্থায় দেখা যায়।
গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় শুধু রান্নাঘর কিংবা সিএনজি স্টেশন নয়, এর প্রভাব পড়ছে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ফলে একদিকে যেমন নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন খাতেও বাড়ছে ভোগান্তি।
গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে রান্না, যাতায়াত ও আয়-রোজগার, সব ক্ষেত্রেই মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।