সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে হাস্কিং চালকল নিয়ে নানা অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যে মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন মালিক ও শ্রমিকরা। তাঁদের দাবি, হাস্কিং মিলগুলো বন্ধ হলে সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হতে পারে।
মিল মালিকদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল হাস্কিং মিলের অবকাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা ও সরকারি বরাদ্দ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
মিল মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, সিরাজগঞ্জে মোট ৩২১টি চালকলের মধ্যে ৩১০টিই হাস্কিং মিল। জেলার বছরে খাদ্যশস্যের চাহিদা প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন। আমন ও বোরো মৌসুমে প্রায় ৪৫ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়। এর উল্লেখযোগ্য অংশ হাস্কিং মিলের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় বলে দাবি মালিকদের।
রায়গঞ্জ উপজেলা মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মোতালেব শেখ বলেন, হাস্কিং মিলগুলো বছরে দুই দফায় সরকারি বরাদ্দ পায়। বরাদ্দ পাওয়ার পর সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চাল প্রস্তুত করে সরবরাহ করা হয়। তবে বছরের অন্য সময়েও চাতাল, বয়লার ও স্টিপিং হাউসসহ বিভিন্ন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে শ্রমিক প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার আগে সার্ভে কমিটি সরেজমিনে মিল পরিদর্শন করে অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই করে। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সবুজ বলেন, রাইস মিলের ব্যবসা দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। অনেক উদ্যোক্তা হাস্কিং মিল দিয়ে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সেমি-অটো ও অটো মিল স্থাপন করেছেন। পাশাপাশি থাকা একাধিক মিলকে একই চাতালের অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মিল মালিক বাবলু শেখ বলেন, সরকার নির্ধারিত মান বজায় রেখে চাল সরবরাহের পরই মিল মালিকেরা অর্থ পান। ছোট ব্যবসায়ীদের সীমিত লাভের মধ্যেই শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, কর ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহন করতে হয়।
তিনি জানান, একসময় রায়গঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৪০০টি মিল থাকলেও বর্তমানে এ সংখ্যা কমে ১৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইতোমধ্যে অনেক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
হাস্কিং মিল বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় দিনমজুরদের ওপরও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন শ্রমিকরা।
রুহুল আমিন, মোকলেছুর রহমানসহ কয়েকজন শ্রমিক বলেন, বছরের বিভিন্ন সময়ে তাঁরা চালকলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মিলগুলো সচল থাকলে তাঁদের আয়-রোজগারের সুযোগ থাকে। মিল বন্ধ হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সংকুচিত হবে।
মিল সার্ভে কমিটির সহযোগী সদস্য ও খাদ্য পরিদর্শক জানান, উপজেলার মিলগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। অচল, পরিত্যক্ত বা ভৌতিক মিলের কোনো তালিকা তাঁরা পাঠাননি। দীর্ঘদিন মিল বন্ধ থাকলে চাতালে ঘাস জন্মানো কিংবা বয়লারের সংযোগ পাইপ খুলে রাখা অস্বাভাবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রায়গঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, তিনি সম্প্রতি অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন এবং সর্বশেষ মিল সার্ভের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। তবে আগামী খাদ্যশস্য সংগ্রহের আগে সব মিল শতভাগ যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, সরকারি বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়। লাইসেন্স, মিল সার্ভে, উৎপাদন সক্ষমতা, বরাদ্দ এবং চালের মান-সবকিছু যাচাই করেই বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, রায়গঞ্জে সরেজমিন যাচাইয়ের পর পাঁচটি মিলের বিপরীতে বরাদ্দ না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল এবং সেগুলোর বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও জানান, মিলগুলোর বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে রায়গঞ্জের কয়েকটি রাইস মিলের বিরুদ্ধে গার্মেন্টসের ঝুট ও প্লাস্টিক পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ উঠেছে। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তুহিন আলম বলেন, অভিযোগগুলো যাচাই করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিল মালিকদের দাবি, অনিয়ম থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে একযোগে হাস্কিং মিল বন্ধ না করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা ও স্থানীয় কর্মসংস্থান, দুই ক্ষেত্রই সুরক্ষিত থাকবে।