চিকিৎসক নারী, রোগী দেখেন স্বামী

সোহাগ রাসিফ

সারাদেশ

দিন দিন ভেঙ্গে পড়েছে স্বাস্থ্য সেবা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সারঞ্জামের অভাব এবং চিকিৎসক-প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতায় সেবা

2026-08-20T12:32:34+00:00
2026-08-20T12:36:48+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
চিকিৎসক নারী, রোগী দেখেন স্বামী
সোহাগ রাসিফ
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম  আপডেট: ২০.০৮.২০২৬ ১২:৩৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
দিন দিন ভেঙ্গে পড়েছে স্বাস্থ্য সেবা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও সারঞ্জামের অভাব এবং চিকিৎসক-প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতায় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। রোগীদের নিরাপদ, মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার নানামূখী পদক্ষেপ নিলেও তা মানছে না অধিকাংশ হাসপাতাল-চিকিৎসক। যে যেভাবে পারছে নিয়মনীতি লঙ্গন করছে। সম্প্রতি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এখানে কর্মরত এক নারী চিকিৎসক নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করে তার পরিবর্তে স্বামীকে দিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ‘প্রক্সি’ ডিউটি করাচ্ছেন বলে জানা গেছে, যা সরকারি বিধি-বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া এই হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক নিয়মিতভাবেই ডিউটি ফাঁকি দেন বলে অভিযোগ উঠে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত ডা. সুস্মিতা সরকার ৪২তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের মাধ্যমে ২০২২ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে তিনি মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। তার স্বামী ডা. সুশেন রায় পেট্রোবাংলার অধীনস্থ হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ডের মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত।

অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. সুস্মিতা সরকার দীর্ঘদিন ধরে নিজ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে তার স্বামীকে দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করিয়ে আসছেন। একজন সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তার পরিবর্তে অন্য কেউ এমনকি তার স্বামী চিকিৎসক হলেও তাকে দিয়ে ‘প্রক্সি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী ও অসদাচরণ। সর্বশেষ গত ২১ জুলাই রাতে ডা. সুশেন রায়কে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমারজেন্সি বিভাগে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। যার সিসি টিভির ফুটেজ ভোরের ডাকের হাতে আসে।

সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা নিজের দায়িত্ব অন্য কাউকে অর্পণ করতে পারেন না, যদি না তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনপ্রাপ্ত হয়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম ভোরের ডাককে বলেন,  ডা. সুস্মিতা ও তার স্বামীকে আমি ডেকেছি এবং পরবর্তীতে যাতে এমন ঘটনা না হয় সেজন্য সতর্ক করেছি। ডা. সুস্মিতার স্বামী নিজেও একজন ডাক্তার, তবে তিনি বিসিএস ক্যাডার নয় এবং অন্য হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন। স্ত্রীর কর্মরত সময়ে তার স্বামী সঙ্গে দেখা করতে আসলেও যাতে চেম্বারে না গিয়ে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করে তা তাদের স্পষ্ট বলে দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, যার ডিউটি সে করবে, স্বামী বা অন্য কেউ করার সুযোগ নেই। পরবর্তীতে এমন ঘটনা ঘটলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে আমি সিভিল সার্জনকে বলে দিয়েছি।

ওদিকে ডা. সুস্মিতা সরকার প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার হাজবেন্ড কি আমার সঙ্গে থাকতে পারে না? উনি আমার সিকিউরিটির জন্য সঙ্গে থাকেন। তবে আমার ডিউটি আমি নিজেই করি। এই বিষয়ে আপনি আমার ইউএইচএফপিও (উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা) স্যারের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন, স্যার এই বিষয়ে অবগত আছেন। সরকারি হাসপাতালে তার স্বামী চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. সুস্মিতা বলেন, তিনি সেবা দেন না, শুধু প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। আমি আমার হাজবেন্ডকে কি লিখতে হবে বলে দেই। আমি তার পাশেই থাকি।

কথোপকথনের একপর্যায়ে নিজের অপরাধ ঢাকতে হাসপাতালের অন্য চিকিৎসকদের ওপর দায় চাপিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ডা. সুস্মিতা। তিনি বলেন, আমার স্বামী যদি ডিউটি করতে না পারেন, তাহলে তো বলতে হয় আমাদের আরএমও (আবাসিক মেডিকেল অফিসার) স্যারের ওয়াইফও তো কখনও ডিউটি করেন না। আরও অনেক মহিলা ডাক্তার আছেন যারা হাসপাতালেই আসে না। আরেকজন ডা. জান্নাতুন নাঈম কেয়া গত চার থেকে পাঁচ মাস ধরে দেশের বাইরে আছেন। তার কোনো ছুটি নেই, অর্জিত ছুটিও নেই। আমাদের মধ্যে কেউ তার স্বাক্ষর করে দেয়, অথচ তিনি দেশের বাইরে। এগুলোও তো কোনো রুলসের মধ্যে পড়ে না।

তার স্বামী ডা. সুশেন রায় প্রথমে অস্বীকার করে ভোরের ডাককে বলেন, মাধবপুর অনেক রিমোট এলাকা। রাতের বেলা এখানে অনেক নিরাপত্তা ঝুকি থাকে। আমার স্ত্রীর যখন রাতে ডিউটি পরে, তখন আমি আসতাম। তবে সিসি টিভির ফুটেজে তাকে চিকিৎসা দিতে দেখা যাওয়ার কথা জানালে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী প্রায়ই অসুস্থ থাকে। একবার ও গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে ৮৪ দিন এনআইসিউতে ভর্তি ছিল। ডিউটিরত সময়ে ও অসুস্থ থাকলে আর রোগীর অনেক চাপ থাকাতে আমি তার পাশে বসে রোগীদের সেবা দিয়েছি। ভবিষ্যতে আমি ডিউটি রুমে আসবো না। এখানের অনেক মহিলা ডাক্তার নিয়মিত হাসপাতালে আসেন না, ডিউটি করেন না বলে অভিযোগ করেন ডা. সুশেন।

জানতে চাইলে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, এক জনের পরিবর্তে আরেকজন চেম্বার করলে বিষয়টি আমাদের জন্যও বিব্রতকর। তিনি অসুস্থ থাকলে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের কাছ থেকে ছুটি নিতে পারেন, কিন্তু প্রক্সি দেয়াতে পারেন না। আশা করছি তারা আর এমনটা করবেন না।

মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মোহাম্মদ ইমরুল হাসান এ বিষয়ে বলেন, আমি বিষয়টি অবগত আছি। ডা. সুস্মিতা বিভিন্ন সময় অসুস্থ থাকে। তাই তার স্বামী তাকে সহযোগিতা করে। সেও যেহেতু একজন ডাক্তার, ফলে তার স্ত্রীকে পাশে রেখে চিকিৎসা দিতেই পারে। এখানে তারা দুজনেই পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। এটা আমাদের জন্য ভালো যে, একজনের জায়গায় দুইজন ডাক্তার চিকিৎসা দিচ্ছে। এছাড়া অন্য মহিলা ডাক্তারগন হাসপাতালেই আসে না এবং বিদেশে থাকাকালীন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মোহাম্মদ ইমরুল হাসান বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো অভিযোগ পাইনি। এগুলো আমার জানা নেই। 
এ বিষয়ে জানতে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. ডা. রত্নদীপ বিশ্বাসের সঙ্গে মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এরপর মোবাইলে এসএমএস করলেও তিনি তার উত্তর দেননি।



Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: