মৌসুম শুরুর আগেই মাচাজুড়ে ঝুলছে কচি শিম। ভোর হতেই মাঠে কৃষকদের ব্যস্ততা—কেউ শিম তুলছেন, কেউ করছেন বাছাই ও ওজন। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের চণ্ডিপাশা চরপাড়ায় আগাম শিম চাষ এখন কৃষকদের বাড়তি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে।
অল্প জমি, তুলনামূলক কম খরচ এবং মৌসুমের আগেই বাজারে শিম সরবরাহ করতে পারায় ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কয়েক বছর আগের পরীক্ষামূলক চাষ এখন এলাকায় রীতিমতো লাভজনক কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
চণ্ডিপাশা চরপাড়ার এক কৃষক মাত্র ২০ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার টাকা। জমিতে থাকা শিম থেকে আরও প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিক্রির আশা করছেন তিনি। সে হিসাবে মোট বিক্রি প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং খরচ বাদে সম্ভাব্য নিট লাভ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
প্রায় সাত বছর ধরে আগাম শিম চাষ করা ওই কৃষক বলেন, অন্য অনেক ফসলের তুলনায় আগাম শিম দ্রুত ফলন দেয়। বাজারে তখন সরবরাহ কম থাকায় দামও তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। এ কারণেই প্রতিবছর তিনি আগাম শিম চাষে আগ্রহী হন।
একই গ্রামের আরেক কৃষক ৩৫ শতক জমিতে শিমের মাচা তৈরি করেছেন। তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এরই মধ্যে তিনি প্রায় ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করেছেন। জমিতে থাকা শিম থেকে আরও প্রায় ২ লাখ টাকা বিক্রির আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর সম্ভাব্য বিক্রি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। খরচ বাদে নিট লাভ হতে পারে প্রায় ২ লাখ ১৪ থেকে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
প্রায় ১০ বছর ধরে আগাম শিম চাষের সঙ্গে যুক্ত ওই কৃষকের ভাষ্য, আগাম শিমে কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও সঠিক সময়ে বাজার ধরতে পারলে লাভের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চণ্ডিপাশা চরপাড়ায় আগাম শিম চাষের যাত্রা শুরু হয় প্রায় আট থেকে ১০ বছর আগে। পাবনা থেকে আনা বীজ দিয়ে কয়েকজন কৃষক প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন। ধীরে ধীরে সাফল্য আসায় অন্য কৃষকরাও এতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
এখন অনেক কৃষক বাইরের বীজের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের ভালো গাছ থেকে বীজ সংরক্ষণ করছেন। এতে বীজের খরচ কমার পাশাপাশি স্থানীয় মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই গাছ থেকে উৎপাদন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের তত্ত্বাবধানে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ পাচ্ছেন তাঁরা। পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি বিভাগের বিভিন্ন সবজি প্রণোদনা, বীজ ও সার বিতরণও কৃষকদের আগাম শিম চাষে উৎসাহ জুগিয়েছে।
চণ্ডিপাশা চরপাড়ার মাঠজুড়ে এখন সারি সারি শিমের মাচা। কৃষকদের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া ও বাজারদর ঠিক থাকলে এ বছর আগাম শিম থেকেই উল্লেখযোগ্য অর্থ উপার্জন সম্ভব হবে।
কৃষকদের এই সাফল্য দেখাচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে চাষ ও সঠিক সময়ে বাজারজাত করতে পারলে অল্প জমিও হতে পারে বড় আয়ের উৎস। আগাম শিম তাই পাকুন্দিয়ার কৃষকদের কাছে শুধু একটি সবজি ফসল নয়, বরং স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন সম্ভাবনার নাম।