
কিন্তু সেই স্বপ্ন ফের হোঁচট খেয়েছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বাদ দিয়ে বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করলে কৃষকের প্রতি বস্তায় প্রায় ৫৪০ থেকে ৫৬০ টাকা লোকসান হচ্ছে। ফলে আগের বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার বদলে চলতি মৌসুমেও নতুন করে লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে তাঁদের।
বর্তমানে কালাইয়ের বাজারে ৬০ কেজির এক বস্তা এস্টোরিক আলু বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকায়। অথচ উৎপাদন, বাছাই, বস্তা, কেয়ারিং, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় হিসাব করলে একই বস্তা আলুতে কৃষকের মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।
অর্থাৎ বর্তমান বাজারদরে এক বস্তা আলু বিক্রি করলেই কৃষকের লোকসান হচ্ছে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। কৃষকদের হিসাবে, বাজারে দাম আরও কমলে ক্ষতির অঙ্কও বাড়বে।
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক শতক জমিতে আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। এ জমিতে গড়ে উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন মণ আলু।
মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ আলুর দাম ছিল প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে কেউ সামান্য লাভের মুখ দেখলেও অনেক কৃষকের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচই পুরোপুরি ওঠেনি। তারপরও ভবিষ্যতে দাম বাড়বে—এই আশায় অনেকে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু হিমাগারে রাখার পর বস্তা, কেয়ারিং, পরিবহন ও ভাড়াসহ প্রতি বস্তায় আরও প্রায় ৫৪০ থেকে ৫৬০ টাকা খরচ যুক্ত হয়। প্রত্যাশিত দাম না বাড়ায় সেই বাড়তি ব্যয়ই এখন কৃষকের লোকসানের অঙ্ক আরও ভারী করছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৫ সালে আলু চাষে লোকসানের পরও তাঁরা চাষ থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবার আরও বেশি ঝুঁকি নিয়েছেন।
কেউ গবাদিপশু বিক্রি করেছেন, কেউ স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখেছেন। অনেকে ধারদেনা ও এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করে আলু চাষ করেছেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, ভালো দাম পেলে প্রথমে ঋণ পরিশোধ করবেন, এরপর সংসারের প্রয়োজন মেটাবেন এবং বন্ধক রাখা গহনা ছাড়াবেন।
কিন্তু বাজারের বর্তমান চিত্র সেই হিসাব উল্টে দিয়েছে। আগের বছরের লোকসান পুষিয়ে ওঠা তো দূরের কথা, চলতি মৌসুমেও বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কালাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১৪টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণের মোট ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৪২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। মৌসুমের শুরুতে এসব হিমাগারে আলু মজুত ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৭ মেট্রিক টন। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত গত চার মাসে হিমাগারগুলো থেকে বের হয়েছে ২৮ হাজার ৪০ মেট্রিক টন আলু। বর্তমানে মজুত রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১৭ মেট্রিক টন।
অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ আলু এখনও হিমাগারে আটকে থাকায় বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
গত মৌসুমে কালাই উপজেলায় মোট ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল। স্থানীয় হিসাবে, এর পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৭৯৬ বিঘা।
আলু সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মৌসুমের শুরুতে কম দামে বিক্রি না করে পরবর্তী সময়ে ভালো দাম পাওয়া। কিন্তু সেই প্রত্যাশিত মূল্যবৃদ্ধি না হওয়ায় হিমাগারে রাখার অতিরিক্ত খরচ এখন কৃষকের ঘাড়ে চাপছে।
কালাই উপজেলার জমিনপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাকিমের হিসাবটি এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তিনি ৬০০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। হিমাগার ভাড়াসহ তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এখন সেই আলু বিক্রি করে তিনি প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা পাওয়ার আশা করছেন। হিসাব অনুযায়ী, চার মাস অপেক্ষা করে বাজারে তাঁর লোকসান হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
আব্দুল হাকিম বলেন, মৌসুমের শুরুতে দাম কম থাকায় ভালো দামের আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশিত দাম আর আসেনি। এখন আলু বিক্রি করলেও বড় লোকসান, আবার হিমাগারে রাখলে বাড়ছে খরচের চাপ।
কালাই উপজেলার মান্নান অ্যান্ড সন্স হিমাগারে আলু ব্যবসায়ী রুবেল, রায়হান ও আলীসহ কয়েকজন জানান, বাজারের দর প্রতিদিনই ওঠানামা করছে। সকালে কৃষকের কাছ থেকে আলু কেনার পর বিকেলে সেই আলু বিক্রি করতে গেলেই অনেক সময় কম দামের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তাঁদের ভাষ্য, কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে। বর্তমানে ৬০ কেজির বস্তা ৮৫০ থেকে ৮৭০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরাও লোকসানের মুখে পড়েছেন।
তাঁদের প্রশ্ন, আলুর বাজার কি আবার আগের অবস্থায় ফিরবে, নাকি আরও কমবে?
কৃষকের লোকসানের এই চিত্র শুধু আলুর দাম কমে যাওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয়, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর বিপণনব্যবস্থা। কৃষক যে দামে আলু বিক্রি করেন, ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সেই আলুর দাম অনেকটা বেড়ে যায়। কিন্তু বাড়তি দামের পুরো সুফল উৎপাদক কৃষক পান না- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
ফলে আলুর ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় বাজারব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস, সংরক্ষণ ব্যয় কমানো, সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো এবং কৃষকদের কাছে সঠিক বাজারতথ্য পৌঁছে দেওয়ার দাবি উঠছে।
কালাইয়ের আলু রপ্তানিকারক ‘সূচি এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সুজাউল ইসলাম জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রায় নয় বছর ধরে বিভিন্ন দেশে আলু রপ্তানি করছে। তবে এবার বিদেশি বাজারে চাহিদা কম থাকায় রপ্তানিও প্রত্যাশিত পর্যায়ে হয়নি।
তাঁর মতে, দেশে আলুর অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ কমাতে নতুন বিদেশি বাজার খুঁজে বের করা এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন, অন্যদিকে দেশের বাজারেও অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে।
আলু শুধু একটি ফসল নয়- উত্তরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের কাছে এটি মৌসুমি বিনিয়োগ, ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারদর সেই অনুপাতে না বাড়ায় কৃষকের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
কালাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ হারুনুর রশিদ বলেন, বর্তমানে আলুর বাজারদর কিছুটা কম। হিমাগারে মজুতের পরিমাণ বেশি থাকায় সরবরাহের চাপও রয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। রপ্তানি ও বিকল্প বাজার বাড়ানো গেলে কৃষক ভালো দাম পেতে পারেন। উৎপাদন খরচ কমানো ও কার্যকর বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে কালাইয়ের আলুর বর্তমান বাজারচিত্র একটি মৌসুমি সংকটের চেয়েও বড় প্রশ্ন সামনে আনছে- কৃষক উৎপাদন করছেন, হিমাগারে ঝুঁকি নিয়ে আলু রাখছেন, ঋণের বোঝা বইছেন; কিন্তু সেই উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেবে কে?
আরও বড় প্রশ্ন- এক মৌসুমের লোকসান সামলে যে কৃষক আবার ঋণ করে মাঠে নামেন, পরের মৌসুমে তাঁর ঝুঁকির নিশ্চয়তা কোথায়?