চলমান পরিস্থিতিতে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও এর উপসর্গজনিত জটিলতা জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁঁকির মধ্যে ফেলছে। প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী হাম ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। দেশে মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গু বিস্তারের পাশাপাশি হামের দাপট ও সংক্রামিত প্রাণঘাতী রোগগুলো জনস্বাস্থ্যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নানা ধরনের প্রাণঘাতী সংক্রামণ বা ভাইরাস ও উপসর্গ জনিত রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ও হাসপাতালে রোগীর চাপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যথাযথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও সচেতনতা ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিশ্চিত হামে ৯৯ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৯৫ জনসহ মোট ৮৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় সারাদেশে মোট সন্দেহজনক হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা বিগত প্রায় ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
শিশুমৃত্যু ঠেকাতে সরকার তড়িঘড়ি টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করলেও হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে। হামের প্রকোপের মধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী। এডিস মশার কামড়ে এর মধ্যেই ঝরে গেছে ৬৫ জনের প্রাণ। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ২৪৩ জন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম আক্রান্তদের বড় একটি অংশ টিকা নেয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি নতুন টিকা দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে জনমুখী করতে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ৫০ বা ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিবর্তে ১৫১ শয্যায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, সরকারের একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনায় বাড়ছে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর। চিকিৎসাকে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক না রেখে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। চলমান সংকট কমাতে স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনে নেওয়া সেবামুখী এই উদ্যোগগুলোকে চ্যালেঞ্জে ফেলছে হাম, ডেঙ্গুজ্বরের মতো প্রাণঘাতী রোগ। তথ্যমতে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। স্বাস্থ্যকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভার সামনে ১৮০ দিনের লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ ধরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৮০ দিনে স্বাস্থ্য খাতের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি এবং আশা করছি সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যেই নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন করব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অতীতে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ এবং কেনাকাটা নিয়ে অনিয়ম ছিল। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বদ্ধপরিকর এবং বিশ্বাস করি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব।’
হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন হামের নয় শতাধিক রোগী ভর্তির চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলো যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখনই ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে। এতে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। গত বছরগুলোতে হাজার হাজার ডেঙ্গু রোগীর ভার সামলানো ঢাকার বড় সরকারি হাসপাতালগুলো এখন হামের রোগীতে ঠাসা। বিশেষজ্ঞদের ভয়, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে এবং স্বাভাবিক সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুশ্চিন্তার বড় কারণ হলো, গত বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী সামলানো ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালটি মার্চের মাঝামাঝি থেকে পুরোপুরি হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এটি আর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করছে না। যার ফলে সম্ভবত রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালের ওপর চাপের বোঝা স্থানান্তরিত হচ্ছে। জুন-জুলাই মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ এবং মৃত্যুতে ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা এ বছর এ পর্যন্ত রেকর্ড করা মোট সংক্রমণের ৪৮ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৭২ শতাংশ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্ষার ভরা মৌসুম অর্থাৎ জুলাই এবং আগস্ট মাসে এই উভয় সংখ্যা আরও বাড়তে পারে; যদি না ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, হামের সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে, তবে তা প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত নয়। তিনি বলেন, বর্ষাকাল মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে এবং এরইমধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। এটি অবশ্যই হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মৌসুমি বৃষ্টির প্রভাবে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু প্রকোপ। ভাইরাসজনিত অন্যান্য রোগের মতো সময়ের সঙ্গে বদলেছে ডেঙ্গুর উপসর্গ। এখন ডেঙ্গু হলেই ১০৪-১০৫ ডিগ্রি তীব্র জ্বর দেখা দিচ্ছে না। ফলে অনেক রোগী বুঝতে পারছে না তার ডেঙ্গু হয়েছে। কিন্তু দেহে প্রাণঘাতী মারাত্মক জটিলতা ঠিকই সৃষ্টি হচ্ছে। ডেঙ্গুর নতুন ধরনের উপসর্গ জানা তাই অত্যন্ত জরুরি। এ সময় জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। ডেঙ্গুর নতুন রূপ ও সংক্রামণের ধরণ বদলেছে। রোগীর শরীরে একাধিক ডেঙ্গু সেরোটাইপ বা নানা ধরনের প্রাণঘাতী উপসর্গ একসঙ্গে ছড়াচ্ছে। অনেক রোগীরই এখন মৃদু জ্বর হচ্ছে বা জ্বর দ্রুত সেরেও যাচ্ছে। শুধু জ্বর-জ্বর ভাবও দেখা যাচ্ছে অনেকের। ফলে রোগী ও স্বজনরা ভাবছে, সামান্য ভাইরাল জ্বর (ইনফ্লুয়েঞ্জা), এমনিই সেরে যাবে। কিন্তু এই অবহেলার ফলে ডেঙ্গু শনাক্ত হতে দেরি হচ্ছে এবং গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে।
ডেঙ্গু হলে তিন থেকে সাত দিনের মাথায় জ্বর আপনা-আপনি কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকেই বলা হয় ক্রিটিক্যাল ফেজ বা বিপজ্জনক সময়। জ্বর কমার এক-দুই দিনের মাথায় রক্তনালি থেকে প্লাজমা লিক, অভ্যন্তরীণ রক্তপাত বা শকের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময় রোগীকে বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও ভেতরে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেন, আগামী দুই মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর একটি বড় ধরনের উল্লম্ফন বা প্রকোপ দেখা দিতে পারে; বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোসহ দেশের আরও কিছু অঞ্চলে।