আন্তর্জাতিক চাপ ও নজরদারির মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের সামরিক ও সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (একিউআইএস)। সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক নজরদারি দলের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সংগঠনটি এখন বাংলাদেশে তাদের নতুন আস্তানা বা বিকেন্দ্রীভূত ‘সেল’ গঠনের উদ্দেশ্যে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের এ আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক প্রসারের উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত নিরাপত্তা পরিষদের ৩৮তম মনিটরিং প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একিউআইএস এখন কোনো বড় সুনির্দিষ্ট ইউনিটে সীমাবদ্ধ না থেকে ছোট ছোট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দলের মাধ্যমে কাজ করছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে লজিস্টিক এবং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বর্তমানে কাবুলে অবস্থানরত সংগঠনটির শীর্ষ পর্যায় আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে, যা তাদের মধ্যকার সুসম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। তা ছাড়া, পাকিস্তানে সক্রিয় ‘ইত্তিহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ (টিএমপি)-এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও এই শাখা কাজ করছে। উল্লেখ্য, এই টিএমপি গত ৯ মে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় এক সশস্ত্র হামলায় ২১ জনকে হত্যা করে।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর ভারতের দিল্লির লালকেল্লা সংলগ্ন ট্র্যাফিক সিগন্যালে যে রক্তক্ষয়ী গাড়ি বোমা হামলা চালানো হয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিল এই একিউআইএস। ওই হামলায় ১১ থেকে ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং অনেকে আহত হন। ঘটনার পর ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) চলতি বছরের মে মাসে ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে, যাদের একিউআইএস সমর্থিত ‘আনসার গাজাত-উল হিন্দ’ সংগঠনের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ফরিদাবাদের আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. উমর উন-নবী, যিনি বিস্ফোরণের সময় নিজে প্রাণ হারান।
কেবল একক হামলা নয়, আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএল বা দায়েশ) মারাত্মক রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরির দিকেও মনোযোগ দিয়েছে বলে বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেছে জাতিসংঘ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইএস তাদের ইংরেজি সাময়িকী ‘ইনভেড’-এ সাইয়ানাইড, বোটুলিনাম টক্সিন এবং বিষাক্ত ‘রিসিন’ তৈরির পদ্ধতি প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ভারতে এক চিকিৎসকের সঙ্গে আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, বিদেশে অবস্থানরত একটি আইএস সেল তাদের বাংলাদেশ ও ভারতে প্রয়োগের উদ্দেশ্যে বিপজ্জনক রিসিন তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল।
এদিকে, সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে আফগান তালেবান সরকারের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত না হওয়ায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে টানা সামরিক সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। এরই সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) তাদের বার্ষিক ‘রাহবারি শুরা’ বৈঠকের পর সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে। নতুন এই বিন্যাসে ‘বেলুচিস্তান ও মধ্যাঞ্চল’ এবং ‘কাশ্মীর ও গিলগিট’ নামে দুটি প্রশাসনিক ইউনিট যুক্ত করার পাশাপাশি ‘টিটিপি বিমান বাহিনী’ নামে একটি বিতর্কিত সামরিক শাখা গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা জাতিসংঘের এই পর্যবেক্ষক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয়ভাবে আল-কায়েদার নেতৃত্ব কিছুটা কোণঠাসা হলেও দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক শাখাগুলো ক্রমান্বয়ে নিজেদের প্রভাব ও নাশকতামূলক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে।