সিলেট নগরীর রায়নগরে গৃহকর্মীর সঙ্গে রঙমিস্ত্রি বাবুল মিয়ার তর্কের জেরে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহকর্মী হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় আটক বাবুল মিয়া হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এর আগে বিকেল ৫টার দিকে নগরীর রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বাবুল মিয়া (৪০) মৃত নূর মিয়া ওরফে নূর কবিরাজের ছেলে। তিনি পেশায় রঙমিস্ত্রি।
এর আগে, বুধবার সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন, বাসার মালিক প্রবীণ ব্যবসায়ী মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৯টার দিকে ওই বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা গেলেও আশপাশের লোকজন প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। আব্দুস সাত্তার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় অনেকে ধারণা করেছিলেন, অসুস্থতার কারণে তিনি হয়তো চিৎকার করছেন।
পরে বাসার বারান্দায় রক্ত দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসার প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। হত্যাকাণ্ডের সময়ও বিদ্যুৎ ছিল না। নিহতদের বাসা ও আশপাশের এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে ঘটনার সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, বাসার একটি কক্ষে আব্দুস সাত্তার এবং অন্য একটি কক্ষে তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ পড়ে রয়েছে। বাসার দক্ষিণ পাশের একটি দরজা দিয়ে হত্যাকারী বের হয়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। ওই পথের নিচে নামার জায়গাতেও রক্তের দাগ পাওয়া যায়।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, বাবুল মিয়া ওই বাড়িতে রঙের কাজ করতেন। এ সুবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করেন। পরে তাহমিনার সঙ্গে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করেন। তাহমিনাকে বাঁচাতে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করা হয়। এরপর আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও আঘাত করে বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, আটক বাবুল মিয়া জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। তবে ঘটনার বিস্তারিত কারণ ও হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ওই বাসায় দুজন গৃহকর্মী থাকতেন। তাঁদের মধ্যে তাহমিনা নিহত হয়েছেন। অপর গৃহকর্মীর এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মইনুল জাকির বলেন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে আঘাত করা হয়েছে। তাঁদের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে এ ঘটনায় প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানান তিনি।
নিহত আব্দুস সাত্তার রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারের আখাখাজনায়। একসময় ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। সন্তানদের মধ্যে এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর প্রাথমিকভাবে ডাকাতি অথবা পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছিল। বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। একটি দলিলও উদ্ধার করা হয়েছে। স্বর্ণালঙ্কার বা মূল্যবান কোনো জিনিসপত্র খোয়া গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের সিআইডি, পিবিআই ও বিশেষায়িত টিম ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে জামায়াত নেতারা
এদিকে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামসহ দলটির নেতারা।
পরিদর্শন শেষে মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, সিলেটসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। নিজের বাসাতেও মানুষ নিরাপদ নয়, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী ও গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় সিলেটবাসী আতঙ্কিত। সাম্প্রতিক সময়ে নগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব ঘটনার বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সিলেট মহানগরী জামায়াতের আমির আরও বলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ সময় জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মহানগর নায়েবে আমির ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, কোতোয়ালি পূর্ব থানা আমির রফিকুল ইসলাম মজুমদার, সাবেক ছাত্রনেতা সিদ্দিক আহমদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, রায়নগরের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় তাঁরা মর্মাহত। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।