খেলাপি ঋণ ২শ' কোটির বেশি নজরদারিতে শীর্ষ ৪২ প্রতিষ্ঠান

কেএম শরিফ ইমতিয়াজ

বাণিজ্য

দেশের ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘদিন ধরে চাপে রাখা বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার নজিরবিহীন এবং কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

2026-08-12T11:21:28+00:00
2026-08-12T11:21:28+00:00
  বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬,
২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
বাণিজ্য
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের তৎপরতা শুরু
খেলাপি ঋণ ২শ' কোটির বেশি নজরদারিতে শীর্ষ ৪২ প্রতিষ্ঠান
কেএম শরিফ ইমতিয়াজ
বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
দেশের ব্যাংকিং খাতকে দীর্ঘদিন ধরে চাপে রাখা বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার নজিরবিহীন এবং কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া এবং ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করে অভিজাত জীবনযাপন করা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের আর ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। বিদেশে অর্থপাচার বা খেলাপি আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) ডাটাবেজ থেকে সম্প্রতি সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য নেওয়া হয়। সিআইবির তথ্য অনুসারে, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের বিদেশে সম্পদ থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। 

এরই মধ্যে দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ৪২টি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের তৎপরতা শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। বিদেশে নামে-বেনামে থাকা সম্পদ উদ্ধার করে খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বিদেশে অবস্থানরত খেলাপিদের সম্পত্তি শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরানোর এই মেগা উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দেশের শীর্ষ ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে। তারা প্রত্যেকেই ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি। অর্থপাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের (বিরুদ্ধে)। বর্তমান সময়ে খেলাপি আদায়ে নতুন এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন পাচার করা জাতীয় সম্পদ উদ্ধার হবে, পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হবে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশের যেসব শিল্পগোষ্ঠীর ৪২টি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত হয়েছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো- এসবি এক্সিম গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, পিকে গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ, সাদ মুসা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ এবং আরামিট গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে পাচার করা সম্পদ খুঁজে বের করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আটটি বড় বিদেশি সংস্থাকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হলো গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস। বিশ্বজুড়ে লিগ্যাল ট্র্যাকিং ও করপোরেট ইনভেস্টিগেশনে এসব সংস্থার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তথ্যমতে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে প্রথম ধাপে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি) এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। এ অর্থ ফেরত আনতে ব্যাংকগুলো কাজ করছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পাচার করা অর্থ কতটুকু ফেরত আনা যাবে, সেটি পরের বিষয়। তবে যারা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত, তারা যেন শাস্তি পায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। জানা যায়, এর আগে চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ১০টি শিল্প গ্রুপ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের অর্থপাচারের ঘটনার তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা পরিচিত বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। ওই সময় আর্থিক খাতের সংস্কারের আওতায় অর্থপাচারের ঘটনা উদ্ঘাটন ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে নানা তৎপরতাও শুরু হয়। সেই ধারবাহিকতায় বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের অনুসন্ধানে দায়ের করা ৯৮টি মামলায় দেশে-বিদেশে মোট ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

বিএফআইইউ-এর তদন্ত অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে অথবা ঋণগ্রহীতা নিজেই বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে থাকা সম্পদ দিয়ে ঋণ আদায় সম্ভব না হলে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় তা জব্দ বা স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে নেওয়া এসব ঋণের বড় একটি অংশ অনাদায়ী হয়ে পড়ায় দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক লুটপাটের এ অর্থের একটি বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ থেকে পরবর্তী ১৫ বছরে ২৮টি কৌশলে দুর্নীতি করে দেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৯ লাখ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে)। এতে দেখা যায়, ওই সময়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা করে বিদেশে চলে গেছে। এতে ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এমন উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশে মামলা চললেও বিদেশে অবস্থান করা ঋণখেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত করে আইনগতভাবে জব্দ বা স্থগিত করার উদ্যোগ ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। 

অনুসন্ধান চলবে বিশ্বজুড়ে ১২টি অর্থনৈতিক কেন্দ্রে : বাঙালি পাচারকারী ও বড় খেলাপিরা সাধারণত যেসব দেশে সম্পদ গড়ে তোলেন বা অর্থ বিনিয়োগ করেন, এমন ১২টি দেশকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এই অনুসন্ধানী মিশন। অনুসন্ধানের আওতায় আসা প্রধান দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (বিশেষ করে দুবাই), কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই ১২টি দেশে চিহ্নিত খেলাপিদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নামে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন, বেনামি মালিকানা এবং বর্তমান বাজারমূল্য যাচাই-বাছাই করছে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক এজেন্সিগুলো। বিদেশের মাটিতে সম্পদ শনাক্ত হওয়া মাত্রই ওই দেশের স্থানীয় আইন অনুযায়ী তা স্থগিত ও জব্দের জন্য দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট বা প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশের মাটিতে সম্পত্তি শনাক্ত ও জব্দ করা ততটা সহজ নয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রচলিত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সেখানকার আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি কিছুটা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে এটিই এখন পর্যন্ত নেওয়া সবচেয়ে সাহসী ও বাস্তবসম্মত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: