বৃষ্টি ও বন্যার অজুহাতে দেশের কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরবরাহে প্রকৃত কোনো সংকট না থাকলেও, এ প্রাকৃতিক অবস্থাকে ঢাল বানিয়ে বিভিন্ন শাকসবজি, কাঁচামরিচ ও অধিকাংশ পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে একটি চক্র। নিত্যপণ্যের বাজারে এখনো অদৃশ্য সিন্ডিকেটের শাসন চলছেই। বৃষ্টি-বন্যাকে ঢাল বানিয়ে বাড়ানো হচ্ছে একের পর এক নিত্যপণ্যের দাম। দেশের যেসব অঞ্চলে বন্যার ছোঁয়াই লাগেনি সেখানকার কৃষিপণ্য নিয়মিত বাজারে আসছে। তারপরও অজুহাত কাজে লাগিয়ে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি আমাদের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের উপর সরাসরি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে খুচরা বাজারের দাম বৃদ্ধিকে কেবল উৎপাদন খরচ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে কাজ করছে শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেট। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্যের যে দীর্ঘ সাপ্লাই চেইন, সেখানে কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া দৌরাত্ম্য বিদ্যমান। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় আমদানিকারক অনেকেই একে অপরের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বা সিন্ডিকেট তৈরি করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব দেখা দেয় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো দাম হাঁকাতে পারে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একাধিক বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজির দামও কেজিতে ১০০ টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। মাছ-মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে পাঁয়তারা শুরু করেছে কোম্পানিগুলো। ইতোমধ্যে তারা সরকারকে চিঠি দিয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই অসাধুচক্র এমন কারসাজির ছক তৈরি করেছে। যার সবচেয়ে নির্মম শিকার নিম্ন আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষ। তবুও এক প্রকার নির্বিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হার- সবুজ মরিচে ১১৬ শতাংশ, আলু ৫০ শতাংশ, পেঁয়াজ ৮৭ শতাংশ, চাল ১০০ শতাংশ, ডাল ৭৮ শতাংশ, বেগুন ৭২ শতাংশ, ডিম ২৫ শতাংশ, গরুর মাংস ১৩ শতাংশ, রুই মাছ ১০ শতাংশ ও মুরগি ২২ শতাংশ। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যে ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতারা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। যা বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্যবৃদ্ধির অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু উৎপাদন খরচ বা সরবরাহ ঘাটতিকেই দায়ী করা যথেষ্ট নয়। বাজার কাঠামোর স্বচ্ছতার অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাবও এক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের আয়ের সিংহভাগই খাদ্যে ব্যয় হয়, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বাজার তদারকি জোরদার করা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনার মতো পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।
এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বন্যা-বৃষ্টিতে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু গত কয়েক দিনে যে পরিমাণে দাম বেড়েছে, তা অস্বাভাবিক। বাজারে যেন অদৃশ্য সিন্ডিকেটের শাসন চলছে। যার যা ইচ্ছা তাই করছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, বাজার তদারকিতে সরকারের যেসব ইউং আছে তারাও যেন এক প্রকার নির্বিকার। সব মিলে ভোগান্তিতে পড়ছেন ভোক্তা।
রাজধানীর একাধিক সবজি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হলে তারাও জানান, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চাঁদাবাজি কিছুটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং এতে ব্যবসায়ীদের ‘হিডেন কস্ট’ কমে এসেছিল। যার ফলে কাঁচাপণ্যের দামও রাতারাতি কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আবার চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে, যা পণ্যের দামেও যুক্ত হচ্ছে। ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে বৃষ্টি ও বন্যার অজুহাতে প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের দামও অত্যধিক হারে বেড়ে গেছে, যা আর আর কমছেই না। মালিবাগ বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা জসিম উদ্দিন জানান, বাজারের কোনো কিছুই বদলায়নি। চাঁদাবাজি চলছে, পণ্যের দামও অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে সরবরাহকারীরা। বৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ানো হয়েছে, তা অস্বাভাবিক।
কথা হলে শ্যামবাজারের পাইকারি বিক্রেতা কানাই সাহা জানান, এখনও বাজারে কমিশন বাণিজ্য চলে। ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে নয়, মোবাইলে বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী বিক্রি হয় এবং সেখান থেকে বিক্রেতারা একটা নির্দিষ্ট কমিশন পান।
যেমন- দেশে আলুর ভালো উৎপাদনের পর কৃষকের কাছ থেকে প্রতিকেজি আলু ১৫ টাকা দরে কিনে মজুদ করা হলেও তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ কেনা দামের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই। কিছুদিন আগে এ ব্যবধান আরও বেশি ছিল। এছাড়া সড়ক ও বাজারে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন পণ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের চক্রগুলো ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুরনো চক্রগুলো বাজারে গেঁড়ে বসেছে। চাহিদা-জোগানের সূত্র কিংবা ক্রয়মূল্যের ওপর ভিত্তি করে দাম বাড়ছে-কমছে না। অসাধুরা আগের কায়দায় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এর চড়া মাশুল গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে; সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন দিন দিন হয়ে পড়ছে দুর্বিষহ। বাজারে পণ্য বিক্রিতে নানা অনিয়ম ও কারসাজির তথ্য বেরিয়ে আসছে সরকারি সংস্থার তদারকি অভিযানেও। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি অভিযানে মিলছে কারসাজির প্রমাণ। অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল বলেন, শুধু সবজি নয়, প্রতিটি পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো পাকা রসিদ, এমনকি পণ্য মজুদের রেজিস্টারও সংরক্ষণ করছেন না। অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত লাভে পণ্য বিক্রি করছেন। আর নেপথ্য থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে অসাধু চক্রও সক্রিয়। তিনি আরও বলেন, আমাদের জনবল খুবই কম। একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এরপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।