মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: কৌশলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে নীতি কাঠামোতে

কেএম শরিফ ইমতিয়াজ

বাণিজ্য

দেশে টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। উচ্চ সুদের হার সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় না নামায়

2026-07-31T19:44:29+00:00
2026-07-31T19:44:29+00:00
  শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬,
১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১ আগস্ট ২০২৬
বাণিজ্য
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: কৌশলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে নীতি কাঠামোতে
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ
কেএম শরিফ ইমতিয়াজ
শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ৭:৪৪ পিএম 
প্রতীকী ছবি
দেশে টানা কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। উচ্চ সুদের হার সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় না নামায় বর্তমান সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোতে পরিবর্তনের কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রচলিত সুদের হারভিত্তিক কৌশল থেকে সরে এসে সরাসরি মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক  আধুনিক মুদ্রানীতি কাঠামো চালুর পরিকল্পনা করছে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এই নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুয়ায়ী, ধীরে ধীরে সুদের হারকে মূল লক্ষ্য না রেখে মূল্যস্ফীতিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নামিয়ে আনার ভিত্তিতে একটি নতুন আধুনিক মুদ্রানীতি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এতে উদ্দেশ্য একটাই- দামের ঊর্ধ্বগতি যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে, যাতে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়চাপ কিছুটা কমে। বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলে এমন বিষয়গুলোকে আরও নির্দিষ্টভাবে ধরতে চাইছে নীতিনির্ধারকরা। অর্থনীতির চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ- এসব দিক সমন্বয় করেই নতুন কৌশলে নীতিগত কাঠামোর দিকে হাঁটছে বাংলাদেশ।

জানা যায়, নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭- এর প্রথমার্ধের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য এই মুদ্রানীতিতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক বা কঠোর অবস্থান বজায় রেখে এবারও নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এটিই হবে প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা। ধারণা করা হচ্ছে, চলমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে না ফেলে কীভাবে উৎপাদনশীল খাতগুলোতে অর্থের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ানো যায়, নতুন মুদ্রানীতির বিবৃতিতে তার একটি রূপরেখা থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং অর্থনীতিকে আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সহজ হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য মুদ্রানীতির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সুদহারের লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোর মাধ্যমে সুদের হার বাড়িয়ে বা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। এ জন্য মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে কার্যকর ও সময়োপযোগী কৌশলী মুদ্রানীতির কাঠামো প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান কাঠামো থেকে ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে রূপান্তর জরুরি। বিশ্বের অনেক উদীয়মান অর্থনীতি এ ধরনের নীতি গ্রহণ করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে এবং বাংলাদেশও একই পথে অগ্রসর হচ্ছে।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। এই হার বাড়ানোর ফলে ব্যাংক ঋণের সুদও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্রহণ কমেছে, বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়েছে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহও সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু এত কড়াকড়ির পরও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিতভাবে কমেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের তিন মাসও মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। ফলে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল কতটা কার্যকর-সে প্রশ্নও উঠেছে। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও কয়েকজন সদস্য এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের প্রশ্ন ছিল, উচ্চ সুদের হার বহাল থাকা সত্ত্বেও কেন মূল্যস্ফীতি কমছে না এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কীভাবে মোকাবিলা করা যায়।

এছাড়াও সুদের হারের লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামো ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোর পার্থক্য সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন মুঠোফোনে বলেন, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি কাঠামোর অর্থ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঘোষণা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বলে আগামী দুই বছরে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে, তখন সুদের হার, তারল্য, বিনিময় হারসহ সব নীতি সেই ৫ শতাংশ লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হবে। অর্থাৎ এখানে সুদের হার লক্ষ্য নয়, বরং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই লক্ষ্য। সুদের হার হলো সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় প্রচলিত সুদের হারভিত্তিক মুদ্রানীতির পরিবর্তে মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্র করে নতুন নীতিকাঠামো গ্রহণের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে সুদের হারকে মূল লক্ষ্য না রেখে নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য অর্জনকে কেন্দ্র করে আধুনিক ও কার্যকর মুদ্রানীতি পরিচালনা করা। তথ্যমতে, বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। এরপর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারসহ সব ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ সুদের হার আর চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকবে না; এটি হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি নীতিগত উপকরণ। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিতে এই ধরনের মূল্যস্ফীতি-লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতি সফলভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দিষ্ট মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করে।

মুদ্রানীতিকে সামনে রেখে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতিতে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বের এক নম্বর সমস্যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। তবে আমাদের অর্থনীতির সামনে মূল্যস্ফীতি আর ডলারের সংকট বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের এই মন্দার ধাক্কা উন্নয়নশীল বিশ্বেও পড়ছে। আমরা ডলারের সংকট মোকাবিলার জন্য এ পর্যন্ত আমদানিকে চেপে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমদানিকে এভাবে চেপে রাখলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। একে চেপে রাখা যাবে না। এ নীতি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে বের হতে হবে।

আসছে মুদ্রানীতি প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একটা মুদ্রানীতি ইতিমধ্যে ঘোষণা করা আছে। এখন দেখার বিষয় প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে যা ঘটেছে বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাকি ছয় মাসের জন্য নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংককে ভাবতে হবে তাদের করনীয় যতটুকু তাতে তারা কী করবে। যদিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না।


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: