চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এবার এ বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে ৫২ হাজার ৭৫৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর মধ্যে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
বোর্ডের ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়ের কোনো বছরেই পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে নামেনি। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের ফলাফলে পাসের হার এক ধাক্কায় নেমে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত ফলাফলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
এবার পাসের হার কমার পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ৯ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন।
বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৮২৩ জন, ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৫০ জন, ২০২২ সালে ১৮ হাজার ৬৬৪ জন এবং ২০২১ সালে ১২ হাজার ৭৯৫ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গত ১৫ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০১২ সালে ৭৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৮ দশমিক ০৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।
২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২০১৭ সালে ৮৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৮৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়।
২০২১ সালে বোর্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এরপর ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২৮ হাজার ৭৭১ জন শুধু একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইংরেজি ও গণিতসহ কয়েকটি বিষয়ে পাসের হার কমে যাওয়া এবং পাহাড়ি ও গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোর আশানুরূপ ফল না করায় সামগ্রিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এবারের পরীক্ষায় তুলনামূলক কড়াকড়িও ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
আট বিদ্যালয়ে পাস করেনি কেউ
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। বোর্ডের প্রকাশিত ‘জিরো পারসেন্টেজ স্কুল’ তালিকায় এসব প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
শূন্য পাসের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকার বিদ্যালয় রয়েছে।
ফটিকছড়ির নারায়ণহাট গার্লস হাইস্কুল থেকে তিনজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কেউ পাস করেনি। রাঙামাটির বরকলের আন্দর মানিক (মাইছছড়ি) জুনিয়র হাইস্কুলে ১০ জন এবং লংগদুর মোহালছড়ি হাইস্কুলে ১৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেও কেউ উত্তীর্ণ হয়নি।
এ ছাড়া সন্দ্বীপের উরিরচর জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ১০ জন, খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়া গার্লস হাইস্কুল থেকে ১৭ জন এবং দীঘিনালার জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাইস্কুল থেকে ১৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানেরও কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
দীঘিনালার তারাবানিয়া হাইস্কুল এবং বাঘাইছড়ির শিলজাক দজার বাজার জুনিয়র স্কুল থেকে পাঁচজন করে পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়নি।
শূন্য পাসের আট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ জন পরীক্ষার্থী ছিল জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাইস্কুলে। এরপর ভাইবোনছড়া গার্লস হাইস্কুলে ১৭ জন এবং মোহালছড়ি হাইস্কুলে ১৫ জন পরীক্ষার্থী ছিল।
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। শিক্ষক সংকট, নিয়মিত পাঠদান, দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, অভিভাবকদের আর্থিক সক্ষমতা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকির বিষয়গুলোও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন কোন প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়েছে, তা চিহ্নিত করা হবে।
তিনি বলেন, শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।