বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ফের অস্বস্তির ছায়া। দিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তীব্র প্রতিবাদ এবং এর পর ভারতের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যের দায় না নেওয়ার ঘোষণা—দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির মাত্রা বাড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ূন কবির বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে প্রচেষ্টা চলছিল, এ ধরনের ঘটনা তার জন্য কোনোভাবেই অনুকূল বা সহায়ক নয়। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এসব বক্তব্যের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তারা এগুলো সমর্থন করে না। কিন্তু এই ধরনের দায় এড়ানোর বক্তব্য বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতায় কোনো জোরালো অর্থ বহন করে না।
এদিকে সম্পর্কের শীতলতার মধ্যেও দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি পিছিয়ে যাচ্ছে না। বরং নতুন বাস্তবতায় ঢাকার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে নয়াদিল্লি। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের পর এই সাক্ষাৎকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তাদের মতে, বৈঠকটি নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার দিল্লির বক্তব্য নিয়ে ঢাকার ক্ষোভের পর ভারতীয় দূতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ দুই দেশের সম্পর্ক কোন পথে এগোচ্ছে, সে বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।
এদিকে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমরা অনেক সম্মান করি। আমি অনেকবার তাঁর বক্তৃতা শুনেছি এবং তিনি কথাগুলো অন্তর দিয়ে বলেন। এটা আমি দেখেছি। তিনি জনগণের ব্যক্তিত্ব, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও জনগণের ব্যক্তিত্ব। আমার মনে হচ্ছে, যখন এই দুই নেতা আলোচনা করবেন, অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের ভেতরের শিশুদের জন্য খেলার জায়গা উদ্বোধন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, সমস্যা চিহ্নিত হয় যখন আমরা আলোচনা করি। আমার বিশ্বাস, মানুষ এক আছে, সমস্যার সমাধান হবেই। এখানে নেতিবাচক কিছু নেই, সব ইতিবাচকই হবে।
জানা গেছে, ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। ঢাকার অভিযোগ, দিল্লির মাটিতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চলমান প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, দিল্লির মাটিতে শেখ হাসিনাকে এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননাকর। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টিও সামনে আনে ঢাকা।
বাংলাদেশের এই প্রতিবাদের পর নয়াদিল্লি দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ওই অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং এতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। শেখ হাসিনা সেখানে যে মতামত প্রকাশ করবেন, সেটিও ভারত সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি একদিকে যেমন বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির কারণ, অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের দায় ভারত সরকার নিতে চাইছে না—দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা অনেকটা এই দ্বৈত অবস্থানের মধ্যেই আটকে আছে।
সরকারের সঙ্গে উষ্ণতা চায় দিল্লি
শেখ হাসিনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক অস্বস্তির বাইরে তাকালে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অভিনন্দন জানান। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের কথাও জানায় ভারত।
এরপর তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার অংশগ্রহণ ছিল দিল্লির পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। নতুন সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পথ খোলা রাখার পাশাপাশি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহও তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা এবং তাঁর শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে ওঠে।
খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি ছিল কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জয়শঙ্করের ঢাকায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎও দুই দেশের নতুন সরকারের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ, একদিকে দিল্লি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ পুরোপুরি গ্রহণ করছে না, অন্যদিকে একই দিল্লি তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও অব্যাহত রাখছে। এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি রেখেই বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে দেখতে হবে।
ব্রিকসের আমন্ত্রণে নতুন বার্তা
সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভারত ব্রিকসের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। ফলে একজন অ-সদস্য দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
এই সফর হলে এটি হবে তারেক রহমানের জন্য ভারতের সঙ্গে সরাসরি শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। একই সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হলে দুই দেশের সাম্প্রতিক অস্বস্তি কাটিয়ে সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরির আলোচনাও হতে পারে।
তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাবেন কি না, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রাজনৈতিক দূত হিসেবে ত্রিবেদী
সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল ঢাকায় দীনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ।
ত্রিবেদী পেশাদার কূটনীতিক নন। তিনি ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ঢাকায় ভারতের শীর্ষ দূত হিসেবে পাঠানোকে নয়াদিল্লির বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, ভিসা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো একাধিক জটিল ইস্যু রয়েছে। এসব বিষয়ে শুধু আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগ নয়, রাজনৈতিক পর্যায়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ত্রিবেদীর নিয়োগের পেছনে সেই রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের লক্ষ্য রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ কারণে সোমবার তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর বৈঠককে স্বাভাবিক সৌজন্য সাক্ষাতের বাইরে দেখছেন কূটনৈতিক মহলের অনেকে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ‘শীতল’ বলার পাশাপাশি এটিও মনে রাখতে হবে যে, দুই দেশই সম্পর্ক ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে।
বাংলাদেশের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী—সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, পানি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে। অন্যদিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে।
ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক ছিন্ন বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দুই দেশের কারও জন্যই লাভজনক নয়।
ঢাকা এখন চাইছে, সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো পক্ষকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।