দেশের হাজারো পথশিশু এখনও জন্ম নিবন্ধনের বাইরে থাকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ অন্তত ১৫ থেকে ২০ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্ম নিবন্ধনের অভাবে তারা নাগরিকত্ব হারায় না, তবে রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা ভবিষ্যতে তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধনে সবচেয়ে বড় বাধা আইন নয়; বরং প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিধিমালা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব।
ইউনিসেফের সহযোগিতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)-২০২৫ অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৫৯ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪৭ শতাংশ শিশুর হাতে জন্মসনদ রয়েছে।
অন্যদিকে, কারিতাস বাংলাদেশের এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর ৬৬৭ জন পথশিশুর মধ্যে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন নেই। জন্ম নিবন্ধনবিহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জানে না এবং ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে না। এছাড়া মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্ম নিবন্ধন না থাকলে শিশুদের স্কুলে ভর্তি, টিকাদান, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, চাকরি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার তালিকাভুক্তি, জমি নিবন্ধন এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবু হাসানাত মোহাম্মদ কিশোয়ার হোসেন বলেন, জন্ম নিবন্ধন না থাকলেও একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব হারান না। তবে আইনি পরিচয়ের প্রমাণ না থাকায় বাস্তবে তারা নানা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পিতা-মাতার পরিচয় বা সব তথ্য না থাকলেও পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন করার সুযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী, যেসব তথ্য পাওয়া যাবে না, সেগুলোর স্থানে ‘অপ্রাপ্য’ উল্লেখ করে আবেদন গ্রহণ করতে হবে। তবে অনেক নিবন্ধন কর্মকর্তা এই বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত অবগত নন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন সহকারী তথ্য সংগ্রহ করে আবেদন প্রস্তুত করেন। পরে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে নিবন্ধক ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে জন্ম নিবন্ধনের বাইরে থাকা হাজারো পথশিশুকে আইনি পরিচয়ের আওতায় আনা সম্ভব হবে। তাদের মতে, জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা শুধু একটি সনদ প্রদান নয়, বরং প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার পূর্বশর্ত।