রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সহনীয় রাখা হলেও দেশের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল যেন অন্ধকারে ডুবে আছে। উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের অসংখ্য এলাকায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী দুই থেকে তিন ঘণ্টা তা থাকে না। দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে ঘরোয়া জীবনÑসবখানেই নেমে এসেছে স্থবিরতা।
বিদ্যুৎ বিভাগ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান বাড়লেই সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায়। ফলে গ্রামাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ কার্যত বৈষম্যমূলক বিদ্যুৎ সংকটের শিকার হচ্ছেন।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রীষ্মকালীন উচ্চ চাহিদা, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ব্যয়ের চাপ- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। তবে এর বড় চাপ বহন করতে হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে।
নাটোরের বড়াইগ্রামের বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, দিনে কোনো রকমে কাজ চলে। কিন্তু রাতে দুই-তিন ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যায়। ছোট বাচ্চা আর বৃদ্ধদের নিয়ে ঘুমানোই যায় না।
কুড়িগ্রামের রাজারহাটের গৃহিণী সেলিনা বেগম বলেন, ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানি তোলা যায় না। সারাদিনের চেয়ে রাতের কষ্ট বেশি।
পটুয়াখালীর গলাচিপার কলেজছাত্রী তানজিলা আক্তার বলেন, রাতে পড়তে বসলে কখন বিদ্যুৎ যাবে তার ঠিক নেই। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছি না।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার এক সেচপাম্প মালিক বলেন, নির্ধারিত সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা ক্ষুব্ধ।
কুষ্টিয়ার এক চালকল মালিক জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন বারবার বন্ধ হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
বগুড়ার এক দুগ্ধ খামারি বলেন, দুধ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে কুলিং সিস্টেম বন্ধ হয়ে যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিকিৎসকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়। যদিও জেনারেটর রয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় অনেক সময় সীমিতভাবে ব্যবহার করতে হয়। এতে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও সব বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমে যায়। পাশাপাশি কিছু কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় গ্রিডে চাপ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে লোডশেডিং থাকবে না। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তা গ্রাহকের চাহিদার তুলনায় কম। তাই বাধ্য হয়েই এলাকায় এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় গ্রিডে সংকট তৈরি হলে তার বড় বোঝা পল্লী এলাকায় চাপানো দীর্ঘদিনের একটি প্রবণতা। তারা বলছেন, বিদ্যুৎ বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত না হলে শহর-গ্রামের বৈষম্য আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের মতো ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেও তারা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে জনঅসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।