চট্টগ্রামের সম্ভাবনাময় এক ক্রিকেটার থেকে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়া মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের উত্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে চাঁদা দাবি, একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আলোচিত এই তরুণকে ২৯ জুলাই যশোরে গ্রেফতার করে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী ডেভিড ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরে। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটে প্রতিভার পরিচয় ছিল তার। বাঁহাতি লেগ স্পিনার (চায়নাম্যান) হিসেবে পরিচিত ইমন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নেট বোলার হিসেবেও কাজ করেছেন। এসএসসি পাসের পর কিছুদিন ওমানে থাকলেও দেশে ফিরে ধীরে ধীরে ক্রিকেট ছেড়ে ছাত্ররাজনীতি এবং পরে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ইমন। অল্প সময়ের মধ্যেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান। পরে ছোট সাজ্জাদ কারাগারে গেলে মাঠপর্যায়ে বড় সাজ্জাদের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব নেন ইমন ও আরেক সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত দক্ষ ইমনের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন শুটারের একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক ছিল। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। আলোচিত মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের বাকলিয়ার জোড়া হত্যা, পতেঙ্গা সৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা এবং চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবির পর সশস্ত্র হামলার ঘটনা।
বিশেষ করে চলতি মাসে চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার অডিও ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন। পুলিশ বলছে, বিদেশি নম্বর থেকে চাঁদা দাবি করে তা না পেলে সশস্ত্র হামলার নির্দেশ দিতেন তিনি।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে অস্ত্রধারী বাহিনী পরিচালনা করতেন ইমন। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলার তদন্ত চলছে।
পুলিশ জানায়, গত ২৫ জুলাই ইমনের দুই সহযোগীকে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেফতারের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশ যৌথ অভিযান চালায়। পরে ২৯ জুলাই ভোরে যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর চেকপোস্টে ছদ্মবেশে ভারত পালানোর সময় ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে আটক করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।