রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন সরাসরি পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। দিনের পর দিন চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে হাজারো পরিবারে। বাধ্য হয়ে অনেকে বৈদ্যুতিক হিটার, ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের মতো বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছেন। এতে যেমন বাড়ছে ভোগান্তি, তেমনি বাড়তি চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ বিলেও। একই সঙ্গে বাজারে বৈদ্যুতিক ও ইনডাকশন চুলার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
রাজধানীর বনশ্রী, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপ কিংবা সরবরাহ না থাকায় নিয়মিত রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সকালে কিংবা দুপুরে নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না থাকায় অনেকেই বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।
রামপুরার একটি ইলেকট্রনিক্স দোকানের বিক্রেতা জানান, আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি বৈদ্যুতিক বা ইনডাকশন চুলা বিক্রি হলেও এখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দামের বৈদ্যুতিক চুলা। পাশাপাশি ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যের ইনডাকশন চুলার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাড্ডার বাসিন্দা গৃহবধূ আঁখি আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। রান্নার সময় প্রায়ই বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে একটি ইনডাকশন চুলা কিনতে এসেছেন।
মিরপুরের বাসিন্দা সাবিনা আক্তার বলেন, সকালে রান্না করতে গিয়ে দেখেন চুলায় গ্যাস নেই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও গ্যাস না আসায় হিটারে রান্না করতে হয়েছে। প্রতিদিন এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিলও বাড়ছে।
রুবিনা ইয়াসমিন নামে বাড্ডার আরেক বাসিন্দা বলেন, গ্যাসের সংকট হলেই পুরো সংসারের কাজ এলোমেলো হয়ে যায়। হিটারে রান্না করতে সময় বেশি লাগে, আবার বিদ্যুৎ খরচও বাড়ে।
এদিকে চলমান গ্যাস সংকটের জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস গ্যাস। সংস্থাটি জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৪৫০ এমএমসিএফডি কমে গেছে। ফলে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকায় সব শ্রেণির গ্রাহক তীব্র গ্যাস স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন।
পেট্রোবাংলাও জানিয়েছে, এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)-এর কারিগরি ত্রুটি দ্রুত মেরামতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। মেরামত শেষ হলে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এফএসআরইউ কবে নাগাদ পুরোপুরি সচল হবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনেও।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে বৈদ্যুতিক ও ইনডাকশন চুলার চাহিদা আরও বাড়বে এবং রান্নার বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহারও সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।